পাহাড়ী প্রকৃতিতে অপূর্ব শিমুলবাগ

বিশ্বজিত রায়
ফেসবুক পেইজেই প্রথম পরিচয় এবং প্রথম দেখা শিমুল বাগের সুশোভিত একটি ছবি। মনে হলো রক্তিম রঙে সুসজ্জিত এক পত্রহীন পুষ্প বাগান। যেন প্রকৃতির বুকে বসন্তের বর্ণালী আয়োজন। সেই থেকে ভাবনা গভীরে বপন করেছিলাম শিমুল বাগ দেখার বিনোদন বীজ। খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জানা গেল শিমুল বাগের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান। সেদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার হওয়া শিমুল বাগের দৃশ্যটা দেখে প্রথম ভেবেছিলাম হয়তো এটি হবে দূরদেশের কোনো প্রকৃতিগত নিঝুম আয়না। এই বৃক্ষ বাগানের প্রকৃত সন্ধান পাওয়ার পর মনে হলো এ-তো ‘বাড়ির পাশে আরশিনগর’। তাকে নিজ নয়নে দেখার লোভ আর সামলাতে পারিনি। চরম আগ্রহ আমায় নিয়ে গেছে সেই তরুতলের সবুজ প্রাঙ্গণে। জনমুখে শোনা শিমুল স্তুতি আমায় আকৃষ্ট করেছে ব্যাপক। তাই শিমুলবাগ নিয়ে আমার রচিত কবিতা দিয়েই শুরু করছিÑ
দেখে এলাম শিমুলবাগ সঙ্গে শালী শালা
পুষ্পহীন পাতা ভরা আছেরে মনু বালা।
শিমুল সারি দেখতে ভারি অপূর্ব সুদর্শন
পাহাড় পারে পল্লীঘরে আঁকড়ে ধরে মন।
জাদুকাটা নদী তীরে গাঘটিয়া মানিগাঁও
সেথায় আছে শিমুলবাগ দেখবে যদি যাও।
যেও তুমি বসন্ত বেলায় ফুটবে অজ¯্র ফুল
শিমুল শাখে দুলবে দেখ লালরঙা কত দুল।
নিসর্গ প্রেমে মত্ত তুমি রোপিয়েছ তরু শিমুল
সবুজ ছায়ায় আরো গুঁজেছ সুগন্ধি লেবু মূল।
মহৎ মনের মানুষগো তুমি বনভূমি করেছ দান
বন উজাড়ি মানুষরে শেখালে বৃক্ষ বুননের গান।
ধন্য তুমি জয়নাল জনাব শিমুল কথা কয়
কবরেতে থাইকা তুমি প্রকৃতি করেছ জয়।
প্রকৃতির লীলাভূমি অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান সুনামগঞ্জের লাউড় নবগ্রাম রাজারগাঁওয়ের শ্বশুরালয় থেকে শালা-শালীসহ ছুটে যাই শিমুল বাগের বিস্তৃত বনে। প্রথমে সঙ্গী স্বজনসহ চড়তে হয়েছে জাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানিতে ভাসমান নৌকায়। রাজারগাঁও গড়কাটির খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে নৌ পারাপারের অপেক্ষা অতঃপর ¯্রােতস্বিনী জাদুকাটা পেরিয়ে শিমুল বাগের উদ্দেশে যাত্রা শুরু। যান্ত্রিক যান টমটমে সওয়ার হয়ে ছুটে চলেছি আমি আমরা। চলতে চলতে দেখা হয়েছে প্রকৃতির সাজানো গুছানো অপূর্ব সম্ভার। হেমন্তের হৈমন্তী রূপ যেন হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে চলেছে মোদের পিছুপিছু। সড়কের দু’পাশে হলদে ধানের নিবিড় সারি মাথা নুয়ে নৃত্যে ভাসছিল অহর্নিশি। প্রকৃতি দর্শনের ব্যকুলতা দেখে মাথার ওপর ছড়ানো আসমানে প্রজ্জ্বলিত সূর্যের ঝিকিমিকি সোনালী আবরণ জানান দিচ্ছে দুপুর গড়িয়েছে দ্রুত এগুতে হবে, নইলে ফিরতে সন্ধ্যা নামবে যে। দিবাকর দাদার এই সাবধানী তাগাদা মাথায় রেখে চারপাশে তাকিয়েছি প্রকৃতি স¤্রাজ্ঞীর রঙিন রূপে মিশে যাওয়ার মানসে।
দুহাত ভরে দিয়ে যাওয়া পথপারের হৈম উপহার আমি গ্রহণ করেছি সযতনে আপন মনে। ফসলী জমির বিস্তীর্ণ মাঠে অঘ্রানের নবান্ন নর্তন দেখে দেখে এগিয়েছি আমরা। কোথাও পাকা আধাপাকা কচি ধান, আবার কোথাও ছিল সদ্য কেটে      
নেওয়া ধান গাছের গুচ্ছ গুড়ালি। কাস্তে কাটা এই ফলনহীন জমি বক্ষে ছিল নতুন বীজ বপনের স্বাদ আস্বাদনের আবাহন। অন্যদিকে লাউ শিমের মাচানে ছিল আকাশ ছুঁয়ার সবুজ প্রতিযোগিতা। তার ওপর বিহঙ্গবেশী শালিক, ফিঙে, বক, বুলবুলি ও অচেনা দলের উড়ন্ত মহরত। তাদের খাদ্য খোঁজার তিড়িবিড়িং প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন ছিল দৃষ্টিনন্দন তেমনি তারা কূজনে কূজনে মাতিয়ে রেখেছে সীমান্তবর্তী এলাকার গাঁও গেরাম। এছাড়া রাস্তার দু’ধারে বাঁশঝাড়ের ঠায় দাঁড়ানো নিভৃতচারী পাহাড়া আমার মনের কাব্যিকতাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। দিয়ে গেছে লেখালেখির বৃহৎ খোড়াক।
গাঁয়ের আঁকাবাকা পথ ডিঙিয়ে যখন হাজির হলাম মনের সুপ্ত বাসনা ছুঁয়ে দেখার দোরগোড়ায় তখন সূর্যটা প্রায় তীর্যক ভঙ্গিমা ধারণ করেছে। প্রথমে দাঁড়িয়ে চারপাশের সুসজ্জিত পরিবেশে মিশে যেতে হয়েছে আমায়। তারপর বালুময় প্রান্ত চরণতলে পিষে শিমুল ভূমে দাঁড়ালাম। তখন দুপুর গড়িয়ে প্রকৃতির গায়ে লেগেছে বৈকালী আভা। এ সময়টায় লোক সমাগম তেমন চোখে পড়েনি। তবে দু’চারজনের দলে বিভক্ত কুড়ি-দশেক উঠতি বয়সী ছেলেপুলেকে দেখা গেছে বাগগহীনে হৈহুল্লুরে মত্ত থাকতে। পাহাড়ঘেষা প্রকৃতির পরিচ্ছন্ন এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে মনে হলো আমরা কোনো খ্যাতনামা বিনোদন স্পটে অবস্থান করছি। যেন চতুর্দিকের বৈচিত্র্যময় রূপ অঙ্গে মেখে নিস্বর দাঁড়িয়ে আছে শিমুল সারি। আর পাতায় পাতায় পূর্ণ সবুজ বাগানের ফাঁকফোঁকরে পেখম মেলেছে গন্ধযুক্ত লেবুর পত্রপল্লব শাখা-প্রশাখা। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছিল শিমুল তলের ভেতর ও বাহিরে। ঘন্টাদেড়েক সেখানে অবস্থান করার সুবাদে দেখা গেল যত সময় যাচ্ছে প্রকৃতিপ্রিয় মানুষের সমাগম তত বাড়ছে। ঘুরতে আসা এই জন আড্ডা মনে করিয়ে দিল সেটা কোনো সাধারণ বাগ নয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় সৃষ্ট একটি প্রশংসাযোগ্য চিন্তা চেতনায় মুড়ানো অসাধারণ বৃক্ষ বাগান।
সৃষ্টির এই স্তুতিধন্য শিমুল বাগের জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণ অনুসন্ধানে ভাসতে লাগলাম। একপর্যায়ে পেয়েও গেলাম বাগানের মালিকপুত্র রাকাব উদ্দীনের দেখা। তিনি সঙ্গী দু’জনকে নিয়ে বাগানে পায়চারী করছিলেন। এদিক ওদিক জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, ওই যে হাঁটছেন তিনি বাগানের মালিক জয়নাল আবেদীনের ছেলে। তথ্যানুসন্ধানের ধীরপায়ে এগিয়ে দাঁড়ালাম তাঁর পাশে। সম্মানসূচক সম্বোধন দিয়ে জানতে চাইলাম বাগ সৃষ্টির আদি কারণ। তারপর অল্প জিজ্ঞাসায় যা জানতে পারলাম তাতে সম্মান প্রদর্শনী বাহবা বিলানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমার সামনে। কারণ আমরা মনুষ্য জাতি যখন প্রকৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ উদ্ভিদ প্রজাতিকে সমূলে ধ্বংস করে চলেছি তখন একজন বৃক্ষপ্রেমিক জয়নাল আবেদীন লুপ্ত হতে যাওয়া সৌন্দর্যবর্ধক শিমুলকে গ্রহণ করলেন নিজের অস্তিত্বে। সিদ্ধান্ত নিলেন প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মেঘালয় পাহাড়ের তলদেশে বয়ে চলা তরঙ্গিনী জাদুকাটা বালুচরের নিজস্ব ভূমিতে গড়ে তুলবেন সবুজ বনায়ন। যেই কথা সেই কাজ। নাম লেখালেন বৃক্ষ সেবায়। প্রায় তেত্রিশ একর ভূমি জুড়ে লাগিয়েছেন সারিবদ্ধ শিমুলের কচি গাছ। সেই ছোট চারা ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আজ শিমুল সবুজে পরিপূর্ণ আবেশ দূর-দূরান্ত ও সন্নিকটের প্রকৃতিপ্রেমী সকল মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছে বন বিশারদ জয়নাল আবেদীনের বিনোদনধর্মী আমন্ত্রন।
অবশেষে বলি, দেখে এলাম জয়নাল আবেদীনের প্রকৃতি সহায়ক সৃষ্টি শিমুল বাগ। বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক এই চেয়ারম্যান সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে নিজস্ব ভূমিতে তৈরি করেছেন শিমুল গাছের এই লুপ্ত প্রজাতি। এছাড়াও সারিবদ্ধ শিমুলের মাঝ মাটিতে গুঁজেছেন সুগন্ধি জাতীয় রসালো লেবুর সরু কান্ড। প্রকৃতি ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু জয়নাল আবেদীন ২০০৩ সালে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ঘাগটিয়া গ্রামের মানিগাঁও নামক পল্লী প্রান্তের নিভৃত স্থানে রোপণ করেন শিমুল গাছের হাজারো চারা। ধীরে ধীরে সেই কচি কান্ড আজকের শিমুল বাগে রূপ নিয়েছে। জাদুকাটার জাদুকরী তীরে নয়নাভিরাম এই বনাঞ্চল সকলকে আকৃষ্ট করবে নিঃসন্দেহে। আস্তে আস্তে বিনোদনের বিস্ময়কর বস্তুতে পরিণত হচ্ছে গিরি গাঁয়ের বিস্মৃত ভূমে জেগে ওঠা অপূর্ব শিমুলতলা। মনে হয় ফলহীন পুষ্প মাতাল বৃক্ষে আচ্ছাদিত সবুজ পাতার ঘন গুঞ্জনে মাতোয়ারা শিমুল প্রকৃতি যেন ডাকছে অচেনা কোনো পথিককে। আমার বিশ্বাস শিমুলের মায়াবী গভীর গাত্র গর্জন বিনোদনপ্রেমী মানুষকে টানবে চুম্বকের মতো। আপনিও দেখে আসতে পারেন জয়নাল আবেদীনের যতেœ গড়া এই শিমুলবাগ।
লেখক:  কলামিস্ট