পিতা হৃদয় কাঁদে

বিশ্বজিত রায়
এক অভিশপ্ত মাসের নাম আগস্ট। এ মাসেই রচিত হয়েছিল ইতিহাসের জঘন্যতম কালো অধ্যায়। ঘাতক দলের মানবতাবিরোধি অপকর্মে সেদিন মানবতার মহীয়সি মূর্তি লজ্জা-ঘৃণায় মুখ লুকিয়ে মূর্ছাগত অবস্থায় পতিত হন। পঁচাত্তর পনেরো আগস্টের আগে পৃথিবী এমন নারকীয় তান্ডব আর দেখেনি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানসহ তৃতীয় বিশ্বের ৪৬টি দেশে অন্তত ৭৩টি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। বাংলাদেশের ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের যে ঘটনা, তার সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনো ক্যুর কোনো মিল নেই। ১৯৭৩-এর সেপ্টেম্বরে চিলির মার্ক্সবাদী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দেকে জেনারেল পিনোশে ক্ষমতাচ্যুত করে তাঁকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ঢাকার ৩২ নম্বরে যে বর্বরতা হয়, তার সঙ্গে কোনো রক্তাক্ত ক্যুরই তুলনা হয় না। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে তৃপ্ত হয় এ দেশীয় কুলাঙ্গারেরা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিঃসন্দেহে বাংলার সিংহ¯্রষ্টা। নানা অভিধায় অভিহিত বঙ্গবন্ধু বাংলা ও বিশ্বের এক অনন্য শান্তির শ্বেত কপোত। মানবতা ও মহানুভবতার বিরল ক্ষমতার উৎস। মুক্তির মঙ্গলময় মহাসাগর। আদর্শ, ত্যাগ, ক্ষমা ও মহত্বের সুমহান দূত। মুমূর্ষু মানবের পরমাত্মীয় পরমপুরুষ। একটি জাতি ও একটি স্বাধীন ভূখন্ডের জনক। সেই মহামানবতুল্য মানুষটিকে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করল কুচক্রী মহল। বঙ্গবন্ধুকে ধ্বংস করে হয়তো তাঁর জীবন্ত গতিকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই তবে তিনি যে কীর্তির খেরোখাতায় কল্যাণকর কর্মের সুবিশাল অর্জন লিখে গেছেন তা কখনও মুছে যাওয়ার নয়। রাজনীতির মহাকবি জীবনের প্রতি পরতে পরতে জন্ম দিয়েছেন ইতিহাস। বঙ্গপত্রে রচিয়েছেন মুক্ত নিশ্বাসের নিশ্চয়তা। শত্রুরা ভেবেছিল অবিসংবাদিত এই নেতাকে হত্যা করলেই শেষ হয়ে যাবে সবকিছু। কিন্তু না, বঙ্গবন্ধু সগরিমায় উদ্ভাসিত। তিনি সমুজ্জ্বল গল্প, উপাখ্যান, কবিতা ও সঙ্গীতের পঙক্তিমালায়। আমার স্বরচিত কবিতায় বঙ্গবন্ধুর বিশালতা এবং ঘাতক সম্প্রদায়ের প্রতি তীব্র ক্ষোভ তুলে ধরার চেষ্টা করেছিÑ
ধিক ধিক ধিকÑ ধূর্ত দানবের দল
মহত্তের এমন মহার্ণব মহীতে বিরল।
কেন নাশিলে বল্ বঙ্গত্বের বলীয়ান বরপুত্র
তিনি মানুষতো নয় নিখাদ ব্রহ্মগোত্র।।
ধিক ধিক ধিকÑ তোরা রক্তপিপাসু ধড়িবাজ
নিষ্ঠুর নখরে কাড়িলে কেন বাংলা অধিরাজ।
বাঙ্গাল বংশের জাঁদরেল জনক একজনই বঙ্গবন্ধু
মহৎমনের মহর্ষি যেন মানবতাবাদী মহাসিন্ধু।।
ধিক ধিক ধিকÑ ওরে ধিকৃত পাপিষ্ট পাল
এ মানুষটাই পীড়িত প্রান্তের ধরেছিল হাল।
চিনিসনে তাঁরে তিনি কত্ত বড় মহীয়ান
কখনও শোধিবে না তাঁর সৃষ্ট অবদান।।
ধিক ধিক ধিকÑ ধৃতাস্ত্র সর্ব অশিষ্ট নিসূদক
শান্তির মাদল হাতে মুজিবর বিস্ময় বাদক।
পারিবেনা পেরে উঠতে জিঘাংসা ছিল তাই
রাজনীতির রাজেন্দ্র বিশ্বে এমনটি আর নাই।।
ধিক ধিক ধিকÑ যত আছিস সারমেয় শাবক
পঁচাত্তর পনেরো আগস্টের তরা চিহ্নিত ঘাতক।
ভাইবা নিলে হাতের মুঠোয় রাজত্ব রাজকন্যা
অশুভ চেতনে ঝরালে বাংলায় বহতা অশ্রুবন্যা।।
ধিক ধিক ধিকÑ তোরা নির্লজ্জ ইতর নরপশু
মনে রাখিস মানুষটা জগৎজয়ী অকল্ক অংশু।
বাগ্বিদগ্ধ চারুদেহী পরমপুরুষ বঙ্গবন্ধু সুমহান
সর্বকালের সর্বোত্তম বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান।।
ধিক ধিক ধিকÑ ধীকৃত দুষ্ট জন্তু জানোয়ার
একাত্তর সাতই মার্চ গর্জিল তাঁর তর্জনী হাতিয়ার।
বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতা সংগ্রামের সমুদ্ভাসিত সিংহমনু
আদর্শ ত্যাগের দুষ্প্রাপ্য ক্ষমতাধর নির্ভীক তপস্বীতনু।।
ধিক ধিক ধিকÑ অসভ্য অসুরের অকৃপ প্রজাতি
মেরেছিস একাত্তরের একীভূত শক্তির একাধিপতি।
মনে রাখিস বঙ্গবন্ধুই ইতিহাসের সমুন্নত মহাকবি
পরপারে গেলেও মুজিব বাঙালির চিরায়ত মহৎ ছবি।।
ধিক ধিক ধিকÑ তমসাচ্ছন্ন সেই প্রেতাত্মা জ্ঞাতি
বঙ্গবন্ধুর বিগ্রহ সম্মুখে আজও জ্বলিছে সশ্রদ্ধ বাতি।
বাংলার মাটিজল পক্ষীপবন কুলাদ্রি তরুলতা
যতদিন বাঁচিবে বাঙালি বলিবে তাঁরই কথা।।
হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়নি। তিনি অবিনশ্বর। তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরন্তর ময়দানে। বাঙালির চিন্তা চেতনায় সর্বদা বিচরণকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাধারণ। মৃত্যু পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মানুষের যে সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন পৃথিবীর কোনো নেতাই তেমনটি অর্জন করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। তাঁর অপরাধ, তিনি বাংলা ও বাংলার মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। গিরি উচ্চতার বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর প্রতিটি কর্মে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’’ যে জাতিকে নিয়ে তিনি সর্বদা ভাবনায় ব্যতিব্যস্ত থেকেছেন সেই জাতির অকৃপ সন্তানরাই চিরতরে নিভিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর জীবন প্রদীপ। ১৯৭২ সালে বিদেশি সাংবাদিকরা ড. কামাল হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় শক্তি কী? উত্তরে সে সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মানুষের প্রতি ভালোবাসা’। তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী? এ প্রশ্নের জবাবেও ড. কামাল বলেন, ‘মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা’। শেষ পর্যন্ত সেই অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসার সুযোগে সজাতি পাকি প্রেতাত্মারাই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে ইতিহাসের জঘন্যতম নারকীয় তান্ডবের জন্ম দিয়ে গেল।
পিতা হৃদয় কাঁদে। অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে চোখ দুটি। শতচেষ্টা করেও আটকাতে পারিনি নোনাজল। আঁখি ফেটে কপুল গড়িয়ে মাটিতে গিয়ে মিশে চক্ষুপানি। তোমার সম্মানে লিখতে বসে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। সামনে ভাসে তোমার তেজস্বী কণ্ঠের প্রতিধ্বনি প্রতিরূপ। কি ভাগ্য নিয়ে জন্মালে তুমি। জীবনভর শুধু দিয়েই গেলে। বিনিময়ে পেলে বুলেটবিদ্ধ বেদনা। পিতা পরপারে ভালো থেকো। এই চাওয়া এ বাঙালি অধমের।
লেখক : কলামিস্ট ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার