‘পুলিশি নির্যাতনে’ উজির মিয়ার মৃত্যু. পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য ঘটনার সত্যতা উদ্ঘাটিত হওয়া আবশ্যক

পুলিশ হেফাজতে থাকা অব্স্থায় নির্যাতনের কারণে উজির মিয়ার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি তার স্বজনদের। মৃতদেহে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা। এমন অভিযোগে বিক্ষোব্ধ লোকজন প্রায় তিন ঘণ্টা পাগলা-সিলেট সড়ক অবরোধ করে রাখেন সোমবার। উজির মিয়া শান্তিগঞ্জ উপজেলাধীন শত্রুমর্ধন গ্রামের বাসিন্দা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিহত উজির মিয়ার ভাতিজা সোহেল মিয়া তালুকদার ও আত্মীয় ফরিদ মিয়ার বক্তব্য হতে হতে জানা যায়, এই মাসের প্রথম দিকে উজির মিয়াসহ গ্রামের ১০-১২টি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। উজির মিয়া রসুলপুর গ্রামের শামিম আহমদসহ কয়েকজনের নামে থানায় অভিযোগ করেন। শামিম আহমদ স্বেচ্ছায় পুলিশের হাতে ধরা দেন। পরে ওই শামীম আহমদকে পুলিশের পোশাক পরিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে উজির মিয়ার বাড়িতে আসে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল। পুলিশের ডাকে উজির মিয়া ঘর থেকে বের হলে একজন এসআই তার মাথায় আঘাত করেন। এসময় পুলিশ উজির মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ কাস্টডিতে থাকার সময় উজির মিয়াকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উজির মিয়া আদালতের মাধ্যমে জামিন নিয়ে বের হওয়ার পর সিলেট ওসমানী মেডিক্যালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও সোমবার আবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তাকে কৈতক হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করেন। নিহত উজির মিয়ার স্বজনরা নির্যাতনের জন্য শান্তিগঞ্জ থানার এসআই দেবাশীষ, পার্ডন ও আক্তারুজ্জামানকে দায়ী করেছেন।
নিহত উজির মিয়ার স্বজনদের দাবি সত্য হলে ঘটনাটি গুরুতর। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। দ্রুত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনও পাওয়া যাবে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ আশ্বাস দিয়েছে। এসব প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে চললে সত্য ঘটনা প্রকাশিত হবে। তখন জানা যাবে স্বজনদের দাবি সত্য কি-না। তবে নিহত উজির মিয়ার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী স্বজনরা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা থেকে অভিযোগের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়ার মত নয়। উজির মিয়ার মৃত্যুর পর এরাকাবাসীর প্রতিবাদ বিক্ষোভের সময় প্রশাসনের কিছু দায়িত্বহীন আচরণও সকলকে অবাক করেছে। বিক্ষোভ চলা কালে শান্তিগঞ্জ উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের গাড়ি দ্রুত বেগে লাশের গা ঘেষে যাওয়ায় লাশের উপর থেকে কাপড় সরে যায়। তখন গুজব রটে গাড়িটি লাশ চাপা দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভটিকে প্রশাসন থামাতে সমর্থ হয়। অবস্থার আর বেশি অবনতি হয়নি। এইক্ষেত্রে গাড়িচালককে আরেকটু সংযত ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিৎ ছিল। নতুবা এমন গুজবের কারণে জনগণের সম্পদ ও জীবনের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারত।
যাহোক, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। এসব অভিযোগ পুলিশের বহুবিস্তৃত সফলতাকে কিছুটা হলেও কলঙ্কিত করে। ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, উজির মিয়া কোন অপরাধী নন। কেন তাকে পুলিশী হেফাজতে নেয়া হল তার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। যে ৩ এসআই’র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাদের অতি উৎসাহের কারণ কী তাও আমাদের বোধগম্য নয়। যখন র‌্যাবসহ পুলিশের নানা ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ তৈরি করা হচ্ছে তখন শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই অভিযোগ সত্যিই ভাববার বিষয়। নিহত উজির মিয়ার ঘটনাটি তাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিৎ। যদি কোন পুলিশ সদস্যের বিচ্যুতি পাওয়া যায় তাহলে পুলিশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা কাম্য।