পৌরসভার তিন গ্রাম যোগাযোগে সাঁকোই ভরসা

আকরাম উদ্দিন
পৌর শহরের অবহেলিত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা কালীপুর, হাসনবশত ও গণিপুর গ্রাম। এই তিন গ্রাম জুড়ে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী, চাকুরিজীবী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, দিনমজুর ও নানা শ্রেণী পেশার মানুষের বসবাস রয়েছে পাশাপাশি অবস্থিত এই গ্রামগুলোতে।
এলাকায় রয়েছে ৪টি মসজিদ, ১টি মাদ্রাসা, ১টি কবরস্থান, ১টি ঈদগাহ এবং একটি সরকারী প্রাইমারী স্কুল। প্রাইমারী স্কুলে রয়েছে তিন গ্রামের হাজারো শিক্ষার্থী। মাদ্রাসায় রয়েছে আরো ২ শতাধিক শিক্ষার্থী।
এলাকার বাসিন্দারা প্রতিদিন গ্রামের ভেতরের খালের ওপর নির্মিত সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। জাওয়ার হাওর থেকে বেরিয়ে আসা খালের ওপর সাঁকো-ই একমাত্র ভরসা যোগাযোগ স্থাপনের।
তিন গ্রামের মানুষের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করে দিয়েছেন মাত্র দুইটি ব্রীজ। প্রতি বছর এলাকাবাসীর উদ্যোগে সাঁকো তৈরি করতে আরো প্রায় ৪০টি। প্রতিটি সাঁকো তৈরিতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয় বলে জানান এলাকাবাসী। হাসনবসত গ্রামের ১০ম শ্রেণীর ছাত্র মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘আমি বন্যার সময় স্কুলে যেতে সাঁকো পারাপারের সময় বাঁশ ভেঙ্গে পানিতে পড়ে যাই। এতে আমার ব্যাগের যাবতীয় উপকরণ ও বই নষ্ট হয়ে যায়। ওইদিন আর আমি শহরের বুলচান্দ স্কুলে যেতে পারিনি। এভাবে আরও মানুষ পানিতে পড়ে।’
কালীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণীর ছাত্রী আয়েশা আক্তার, তারমিন বেগম, সুমাইয়া খাতুন, জুয়েল আহমদ ও শিমুল আহমদ সাঁকো পারাপারে নানা দুর্গতির কথা জানান। তারা জানান, যেকোনো মৌসুমে সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করতে তাদের ভয় হয়।
হাসনবসত গ্রামের রকিব মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর গ্রামের মানুষ মিলে এসব সাঁকো তৈরি করেন। এতে কম হলেও ১০ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। বছর বছর এভাবে খরচ করে সাঁকো তৈরি করেন গ্রামবাসী। নইলে অন্যান্য গ্রামের সাথে যোগাযোগ  
বন্ধ হয়ে যাবে।’   
শহরের মল্লিকপুর এলাকায় সুনামগঞ্জ-সিলেট রোড থেকে পূর্ব দিকের পুরাতন পাকা রাস্তা দিয়ে সামান্য এগালেই কালীপুর গ্রাম। এই গ্রামের রাস্তার পাশে বিদ্যুতের খুঁটিতে বাতি নেই। এতে প্রতিনিয়ত জন চলাচলে ঘটে নানা দুর্ঘটনা। এছাড়াও রাতের বেলায় দুর্বৃত্তরা এলাকায় নানা অপরাধ করে চলেছে। সুনামগঞ্জ-সিলেট রোড থেকে শুরু হওয়া পাকা রাস্তার বিভিন্ন স্থান ভেঙ্গে ছোট বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত মেরামতের উদ্যোগ নেই বলে জানান এলাকার বাসিন্দা সাবিনা ইয়াসমিন, শহীদ মিয়া, মো. দিলোয়ার হোসেন, আব্দুল হক, আজগর হোসেন, মিজানুর রহমানসহ আরও অনেকে। তাঁরা জানান, এই পাকা রাস্তা প্রতি বছর বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এলাকায় নিরাপদ পানির সমস্যা ও স্যানিটেশনের সমস্যা রয়েছে প্রকট।
হাসনবসত গ্রামের বাসিন্দা দেওয়ান আলী, নোয়াব আলী, ইছব আলী, লাল মিয়া, আব্দুল আলী, প-িত মিয়া জানান, সাঁকোর পরিবর্তে বক্স কার্লভার্ট নির্মাণ করলে কৃষি কাজে পানি ব্যবহার করা যাবে এবং যাতায়াত ব্যবস্থাও নিশ্চিত হবে। এই এলাকার ইটসলিং রাস্তা প্রতিদিন খসে পড়ছে। দীর্ঘদিন যাবত মেরামত হচ্ছে না। মানুষ ও গাড়ি চলাচলে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। এবার বৈশাখ মাসে হাওরের ধান নিয়ে আসতেও মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হবে গ্রামবাসীদের। এলাকায় নিরাপদ পানির সমস্যা ও স্যানিটেশনের সমস্যা রয়েছে। এই এলাকার ঈদগাহের মাঠ ও কবরস্থান বন্যায় পানিতে তলিয়ে যায়। এই দুই স্থানে মাটি ভরাটের জরুরি প্রয়োজন।
গণিপুর গ্রামের সাদিয়া খাতুন, সাহেদ আলী, শিমুল মিয়া ও রুমেন আহমদ জানান, এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে। স্যানিটেশনের মারাত্মক সমস্যাও রয়েছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলেও বাড়ি বা পাড়া-মহল্লার রাস্তার কোনা উন্নয়ন হয়নি।
তিন গ্রাম জুড়ে রয়েছে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় হাজারো শিক্ষার্থী। সকল শ্রেণী পেশার মানুষের একটি স্বপ্ন হাইস্কুল স্থাপনের।  যদি এই এলাকায় হাইস্কুল স্থাপিত হয়, তবে শিক্ষার হার বেড়ে দ্বিগুণ হবে বলে জানান এলাকাবাসী। ইতিমধ্যে এলাকার কর্মঠ কিছু যুবক এই খালের কিছু অংশে মাছের চাষ শুরু করেছেন। এবার শুরু হওয়া এই মাছের চাষে রয়েছে সাফল্যের বিপুল সম্ভাবনা। তাঁরা পর্যায়ক্রমে সুদীর্ঘ এই খালের পুরো অংশে মাছের চাষ করবেন বলে জানান।
পৌর কাউন্সিলর খুর্শিদ আলম বলেন, ‘কালীপুর, হাসনবসত ও গণিপুর গ্রামের মানুষ খুবই কষ্টে যাতায়াত করেন। গ্রামের বয়স্ক মানুষ কষ্ট করে সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করেন। এসব কষ্ট দেখে আমি কয়েকটি সাঁকোর কাজ করে দিয়েছি। এবার প্রায় সব সাঁকো ভেঙ্গে গেছে। আমি পরিষদে এইসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, আশাকরি মেয়র সাহেব ব্রীজ নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন।’