প্রজ্ঞাবান শিক্ষককে হারিয়েছি আমরা

এ.কে.এম আজাদ
সুনামগঞ্জের শিক্ষক পরিবার হারালো এক প্রজ্ঞাবান, মেধাবী ও জনপ্রিয় শিক্ষককে। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জের সিনিয়র শিক্ষক মোহাম্মদ আনিছুর রহমান কামাল ঢাকার একটি ক্লিনিকে মৃত্যুবরণ করেন। জলজ্যান্ত তরতাজা মানুষ। যিনি ক্লিনিকের কেবিনে আছরের নামায আদায় করেন।
তার মৃত্যুর সংবাদ মুহুর্তেই সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সৈয়দ রাফি ফোনে জানানোর পর বিশ্বাস করছিলাম না। কারণ তিন (০৩) দিন আগেও তার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল। কন্ঠে ভাসছিল সেই স্বাভাবিক কথা। “আছি মোটামুটি ভাল। দোয়া কইরেন।” আমার ঘরের সবাই ঘিরে ধরেন আমাকে। আমার মা, স্ত্রী, মেয়ে কান্না শুরু করেন। আমার পরিবারের সবাই প্রচন্ডভাবে ভালো পেতেন কামালকে। বন্ধু মোত্তাকিনকে ফোন করে বিষয়টি নিশ্চিত হলাম। নিজেকে সামলিয়ে দ্রুত কামালের বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।
প্রয়াত আনিছ কামাল জুবিলীর ৯০ ব্যাচ এর একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আমার এক (০১) ব্যাচ পরের। তাই তাকে নাম ধরে কামাল বলেই ডাকতাম। সেও আজীবন বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করে গেছে। তার বাবা জুবিলীর শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক জনাব মোঃ মকবুল হোসেন। দীর্ঘ পঁচিশ (২৫) বছর জুবিলীতে চাকুরী করার পর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে অবসরে যান। কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ পাশ করে বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। ২০০১ সালে চাঁদপুর হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে প্রথম যোগদান করেন। এই বৎসরেই সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। দীর্ঘ তের (১৩) বৎসর সেখানে চাকুরী করার পর ২০১৪ সালে নিজ বিদ্যালয় সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। সে এমন এক পরিবারের সন্তান যার বাবা-মা ছয় (০৬) ভাই-বোনকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করান।
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, সন্ধ্যায় সারা শহরে তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাহাকার চলতে থাকে। শিক্ষক পরিবার কামালের অকাল মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। শোক প্রকাশ করতে থাকেন বিভিন্নভাবে। সরকারি জুবিলী এবং সরকারি এস.সি.র শিক্ষার্থীদের কান্নাজড়িত স্ট্যাটাস স্যোসাল মিডিয়াকে সিক্ত করে তোলে। পরদিন সরকারি জুবিলী প্রাঙ্গনে তার জানাযায় শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং শুধীজনদের উপস্থিতি কামালের প্রতি সবার ভালোবাসার বহি:প্রকাশ ঘটায়।
কামাল সবার প্রিয় ছিল। কারণ সে ছিল আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। প্রচলিত সমাজের কোনো ক্লেদাক্ত রূপতাকে স্পর্শ করতে পারেনি। যা বর্তমান সময়ে বিরল। শিক্ষক হিসেবে কামাল ছিল শিক্ষার্থীবান্ধব। শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার ক্লাস শুনত। তাকে অনুসরণ করত। সারাক্ষণ সে শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় এসবের উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনাকরত। দীর্ঘ বিশ (২০) বৎসর কর্মকালে তার সাথে আমার উঠাবসা। চলাফেরা। এই লম্বা সময়ে আমি কারো প্রতি তাকে রাগতে দেখিনাই। কারো প্রতি কটুক্তি করতে শুনি নাই। অবিশ্বাস্য হলেও তাই সত্যি।
আরেকটি ঘটনা আমাকে অবাককরত। রিক্সায় কোথাও গেলে সে ভাড়া দ্বিগুণ দিত। কাজের শ্রমিককে প্রাপ্যতার চেয়ে বেশি মজুরী দিত। এটাই তার স্বভাব।
এতসব গুণের অধিকারী লোক সমাজে বিরল। কামালের মতো শিক্ষক এর মৃত্যু শিক্ষা পরিবার ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার আদর্শ ধারণ সমাজ ও নিজের কল্যাণের জন্য সবার অপরিহার্য।
কবি সুফিয়া কামালের মতো সেও বলতো,
“মুক্তি লভে বন্দি আত্মা সুন্দরের স্বপ্ন আয়োজনে
নিঃশ্বাস নিশ্বেস হোক পুষ্পবিকাশের প্রয়োজনে।।
কামালের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। পরপারে ভালো থেকো প্রিয় অনুজ প্রতিম আনিছ কামাল।
লেখক: সিনিয়র শিক্ষক, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ।