জেলা পরিষদ নির্বাচনের লক্ষে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করেছেন কর্তৃপক্ষ। পুরো জেলাকে ১৫টি ওয়ার্ডে বিভক্ত করে গণশুনানির জন্য গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর কিছু কিছু এলাকার বাসিন্দারা দ্বিমত প্রকাশ করেছেন। গণশুনানীঅন্তে এইসব সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু আসল কাজ যেটি অর্থাৎ জেলা পরিষদ নির্বাচন কবে হবে, আদৌ হবে কিনা, হলে প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ ভোটে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নির্বাচিত হবেন সে নিয়ে ধোয়াশা কাটছে না। আপাতত যেটুকু শুনা যাচ্ছে তা হলো, ১৫ ওয়ার্ডের ১৫ সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের ৫ সদস্য পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। চেয়ারম্যান নির্বাচন পদ্ধতি বিষয়ে কোন কিছুই জানা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পর পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের কোন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। পরাধীন পাকিস্তানি মৌলিক গণতন্ত্রের আমলে এমন ব্যবস্থা ছিলো। সুতরাং এই দেশের তরুণ-যুবক সমাজের কোনরূপ পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটি পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি দেখার সুযোগ হচ্ছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়। পাকিস্তানি মৌলিক গণতন্ত্রি আমলে পরোক্ষ ভোটের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের অভিজ্ঞত্ াআমাদের জন্য খুব বেশি সুখকর নয়। এইভাবে সরকার তখন নিজেদের জন্য একটি বশংবদ ও অনুগত দল তৈরি করতে সক্ষম হলেও মাটি ও মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে ওই পদ্ধতি স্পষ্টতই তখন ব্যর্থ হয়েছিলো। পরাধীন আমলের ওই ব্যর্থতা স্বাধীন দেশে সফল হবে কিনা তা কেবল বলা সম্ভব পদ্ধতি প্রযুক্ত হওয়ার পরই। তবে আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এই পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিটি খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে, এমন মনে হচ্ছে না দেশবাসীর নিকট।
পরোক্ষ ভোটের এই পদ্ধতিতে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ ভোট দিয়ে নিজ নিজ এলাকার জেলা পরিষদ প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। বুঝাই যায়, জেলা পরিষদের সাধারণ ও সংরক্ষিত পদে যেসব প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তাদেরকে সাধারণ নির্বাচকম-লী তথা জনগণের কাছে যেতে হবে না। নিজ অধিক্ষেত্রের হাতে গোনা কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সমর্থন সংগ্রহ করতে পারলেই তাঁর বিজয় নিশ্চিত। এই পদ্ধতিতে সংখ্যাল্প নির্ব্চাকম-লী অতি ক্ষমতাবান হিসাবে ভূমিকা রাখবেন। সংগতকারণেই তাঁদের প্রভাবিত করতে প্রার্থীরা নানা ধরনের বৈধ অবৈধ পন্থা অনুসরণ করবেন। এইভাবে জনগণের সাথে সরাসরি সম্পর্কহীন অবস্থায় নির্বাচিত জেলা পরিষদ জনগণের কল্যাণে কিভাবে ভূমিকা র্খাবে তা এক বড় প্রশ্ন। নির্বাচিত জেলা পরিষদ সদস্যরা যেহেতু জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হননি তাই জনগণের কাছে তাঁদের কোন দায়বদ্ধতাও থাকবে না। সাধারণ মানুষও তাঁদেরকে নিজের প্রতিনিধি বিবেচনা করতে দ্বিধান্বিত হবেন। এরকম অবস্থায় জেলা পরিষদটি অপরাপর আরও বহু আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের চরিত্রই ধারণ করবে।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্য পদ সাধারণ নির্বাচকম-লীর সরাসরি ভোটে গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের নিকট অনুরোধ জানাই। পরোক্ষ ভোটের বিষয়টি সম্ভবত আমাদের বর্তমান সংবিধানও সমর্থন করে না। তাই এরকম উদ্যোগ গৃহিত হলে আইনি জটিলতারও উদ্ভব ঘটতে পারে। স্থানীয় সরকার কাঠামোয় জেলা পরিষদ একটি অন্যতম উচ্চতর সংস্থা। দেশের অপরাপর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যখন প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে গঠিত তখন জেলা পরিষদটি এর ব্যতিক্রম হলে অন্য কাঠামোগুলোর সাথে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হবে। নি¤œধাপের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করতে প্রচুর সমস্যা তৈরি হবে। এরকম সমস্যা তৈরির পরিবর্তে গণতন্ত্রের মূল সুর অর্থাৎ জনগণের ভোটে শক্তিশালী জেলা পরিষদ গঠন করাই হবে উত্তম কাজ।

