স্টাফ রিপোর্টার
ছাতকের নোয়ারাই গোদারাঘাট থেকে ছাতক থানা পুলিশ সিলেট এমসি কলেজের গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামী সাইফুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। বুধবার ভোরে ছাতক শহরের নোয়ারাই খেওয়াঘাট থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। গ্রেপ্তারকৃত আসামী সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য নাজমুল ইসলাম সমর্থিত ছাত্রলীগ কর্মী।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানান, রবিবার ভোরে তারা খবর পান সাইফুর রহমান ছাতক শহর থেকে খেওয়া পাড় হয়ে সুরমা নদীর উত্তরপাড়ে যাচ্ছিল। এসময় এসএসপি সার্কেল বিল্লাল হোসেন, ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি মিজানুর মিজানুরসহ একদল পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
পরে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুপুর ১ টায় তাকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে, এমসি কলেজে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা রবিউল ইসলাম ও তারেক আহমেদকে গ্রেফতার করতে অভিযান চালায় দিরাই ও জগন্নাথপুর থানা পুলিশ। তারেকের গ্রামের বাড়ি জগ্ননাথপুর উপজেলা ও রবিউলের
গ্রামের বাড়ি দিরাই উপজেলায় অভিযান চালানো হয়। শনিবার বিকেলে দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়।
জগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিবলী আহমেদ বেগ জানান, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় রবিউলের নিজ গ্রামসহ পুরো উপজেলায় ক্ষুব্ধ মানুষ ধর্ষকদের ঘৃণা জানাচ্ছে। তারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আশরাফুল ইসলাম জানান, রবিউলকে গ্রেফতার করতে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য শনিবার বিকেলে পুলিশ গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইখতিয়ারউদ্দিন চৌধুরী জানান, আলোচিত মামলার আসামি গ্রেফতার করতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।
মামলার আরেক আসামী অর্জুন লস্করকে ভোরে হবিগঞ্জর মাধবপুরের মনতোলা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মাধবপুর থানার ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুরের মনতোলা সীমান্ত থেকে অর্জুন লস্করকে গ্রেপ্তার করে সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। তাকে সিলেট নিয়ে আসা হয়েছে।
পুলিশ ও পাশবিকতার শিকার তরুণীর পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০ বছর বয়সী ওই গৃহবধূর বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমায়। শুক্রবার বিকেলে তিনি স্বামীর সঙ্গে নিজেদের গাড়িতে করে ঘুরতে বের হন। একপর্যায়ে তারা এমসি কলেজ এলাকায় বেড়াতে যান। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে স্বামী-স্ত্রী গাড়িটি রেখে একটি দোকান থেকে কেনাকাটা করেন। পরে গাড়িতে ফিরে সেখানেই বসে গল্প করছিলেন তারা। রাত ৮টার দিকে পাঁচ যুবক তাদের গাড়িটি ঘিরে ধরে স্বামী ও স্ত্রীকে জোর করে গাড়ি থেকে নামায়। তাদের মধ্য থেকে তিন যুবক তরুণীকে টেনেহিঁচড়ে সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকার ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের দিকে নিয়ে যায়। স্বামীকে গাড়ির মধ্যেই আটকে রাখে দুই যুবক। ঘণ্টাখানেক পর স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে যুবকরা দৌড়ে পালিয়ে গেলে তিনি ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের সামনে গিয়ে স্ত্রীকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পান।
ওই ঘটনা সম্পর্কে একাধিক শিক্ষক ও পাশের আবাসিক এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলছেন, এক ব্যক্তির চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ পাচ্ছিলেন। তখন তারা সেদিকে নজরদারি করলেও আতঙ্কে কেউ সামনে যান নি। একপর্যায়ে নারীর চিৎকার শুনে স্টাফ কোয়ার্টার থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীকে আতঙ্কিত অবস্থায় দেখতে পান। পরে তারা পুলিশে খবর দেন। রাত ১১টার দিকে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। বর্তমানে তাকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ওই তরুণীর স্বামী পুলিশকে বলেছেন, ঘটনায় জড়িতদের দু’জনকে তিনি আগেও ওই এলাকায় দেখেছেন। কয়েকজন তার সামনে থেকে স্ত্রীকে টেনে ছাত্রাবাসের দিকে নিয়ে যায়। তিনি চিৎকার দিলেও কেউ শুনছিল না। পরে তাকে ছেড়ে যুবকরা চলে গেলে লোকজন জড়ো হয়।
গত শুক্রবার ওই বর্বরোচিত ঘটনার পর ক্ষোভ, নিন্দা আর ধিক্কারে সরব হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সংগঠন। অবিলম্বে ধর্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবি সবার। বন্ধ ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ কর্মীদের থাকতে দেওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, ১২৮ বছরের পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় এক কলঙ্কজনক ইতিহাস সৃষ্টি হলো।
এ ঘটনায় গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে নগরীর শাহপরাণ থানায় ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে এজাহারে ছয় আসামির নাম রয়েছে, তিনজন অজ্ঞাত পরিচয় আসামি রয়েছে। নাম থাকা আসামিদের ছয়জনই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। তারা হলেন- সাইফুর রহমান (২৮), তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক আহমদ (২৮), শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি (২৫), অর্জুন লস্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুম (২৫)।
এজাহার অনুযায়ী, আসামি সাইফুর রহমানের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে। তাঁর বর্তমান ঠিকানা এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলো। শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনির বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনিপাড়ায়। বর্তমান ঠিকানা ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ২০৫ নম্বর কক্ষ। মাহফুজুর রহমান ওরফে মাসুমের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামে। রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় জগদল গ্রামে। অর্জুনের বাড়ি জকিগঞ্জের আটগ্রাম। তারেক সুনামগঞ্জ শহরের নিসর্গ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা।
কলেজ সূত্র জানায়, সাইফুর, রনি ও মাহফুজুর ইংরেজি বিভাগের স্নাতকের অনিয়মিত শিক্ষার্থী। অর্জুন প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তারেক ও রবিউল বহিরাগত। অন্য আসামিরা যাতে কোনোভাবে পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য সিলেটের সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি জারি করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত সাইফুর ও অর্জুন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক রণজিৎ সরকার বলয়ের অনুসারী সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য নাজমুল ইসলাম সমর্থিত ছাত্রলীগ কর্মী। সে বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাই পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাহমিদ মিয়ার পুত্র। আর অর্জুন জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রাম গ্রামের কানু লস্করের পুত্র।


