কামরুল জাহাঙ্গীর
বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হওয়ার ৮২ তম দিনে এসে ২৮ মে তারিখে শনাক্তকৃত কোবিড ১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়াল। এদিন মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ৪০৩২১ জন। এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ঘর ছাড়িয়েছিলো ১১ মে। ঠিক ১৬ দিন পর এই সংখ্যা দৈনিক ২ হাজার ছাড়াল। গত দুই সপ্তাহ ধরে শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা প্রায় প্রতিদিনই বর্ধনশীল। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্ত হওয়া রোগীর শতকরা হার ২০ এর ঘর ছাড়িয়ে গেছে। ২৮ মে পরীক্ষার বিপরীতে আক্রান্তের হার ছিলো ২২%। প্রতি ১০ হাজার রোগী শনাক্ত হতে দিনের সংখ্যা ক্রমাগত কমছে। প্রথম ১০ হাজার রোগী শনাক্ত হতে যেখানে ৫৮ দিন লেগেছিল সেখানে ২য় ১০ হাজার রোগী বেড়েছে ১১ দিনে। ৩য় ও ৪র্থ ১০ হাজার রোগী বাড়তে সময় লেগেছে যথাক্রমে ৭ ও ৬ দিন। বাড়ার এই ব্যপ্তিকাল ক্রমশ কমছে। সুতরাং রোগী সংখ্যা লাখ ছাড়াতে আর বেশি দিন সময় লাগবে না।
কোভিড ১৯ এর বাংলাদেশ পরিস্থিতি এখন অবনতিশীল। এই অবস্থায় আমাদের আরও অনেক বেশি সাবধান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ৩১ মের পর থেকে সরকার তথাকথিত সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর সবকিছুই খুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা ও ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ৩০ মে পর্যন্ত নিয়ে গেলেও কার্যত প্রথম ২ সপ্তাহ পর থেকেই ক্রমশ এর কার্যকারিতা কমতে থাকে। শেষের দিকে শুধু দূরপাল্লার গণপরিবহন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ছাড়া আর কোথাও সাধারণ ছুটির প্রতিফলন দেখা যায়নি। যেটুকু রাখঢাক ছিল ৩১ মে থেকে সেটুকুও আর থাকছে না। এই অবস্থায় মহামারী আমাদের এক ভয়ানক পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলা চলে।
কোভিড ১৯ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে সবগুলো প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। সরকার খুব বেশি কঠোরতা অবলম্বন করতে পারেনি। জনসচেতনতা কম থাকলে কঠোরতা ভিন্ন নিয়ম মানানোর চিন্তা করা গাধার মুখ থেকে সংগীত শ্রবণ করার মতই এক অর্থহীন প্রয়াশ। অথচ আমরা ”যার যার সুরক্ষা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে” বলে সবকিছু খুলে দিচ্ছি। এই নিশ্চিন্তি যে অচিরেই গলার ফাঁস হয়ে উঠবে তা বলা যায় অনায়াসে। আমরা এক ভয়ংকর মৃত্যুপুরীর দিকে ধাবিত হচ্ছি। সেই অপ্রত্যাশিত কালবেলার সময়ে ভেঙে পড়বে সমস্ত শৃঙ্খলা, নিয়মনীতি, শাসন-অনুশাসন, প্রথা, সংস্কার, বিধি-বিধান; সবকিছু। দিকভ্রান্ত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে, ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে দিশেহারা হয়ে উন্মাদের ন্যায় আচরণ করতে শুরু করবে। যে অর্থনীতি রক্ষার নাম করে আমরা এখন মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করছি তখন সেই অর্থনীতি কাচের ঘরের মতো খানখান হয়ে যাবে।
পৃথিবীর যেসব দেশ লকডাউল শিথিল করছে, বিশেষ করে– আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো; তারা কখন এই শিথিলতা দেখাতে শুরু করছে? তারা যখন দেখল- আক্রান্তের পরিমাণ কমছে এবং কমার ধারা বেশ স্থায়িত্ব পাচ্ছে, তখনই তারা শিথিল হওয়ার চিন্তা শুরু করেছে। বিপজ্জনক মাত্রায় আক্রান্ত রোগী বাড়ার অবস্থায় কোনো দেশই লকডাউন প্রত্যাহার করার পথে হাঁটেনি। আমাদের পার্শবর্তী ভারতও লকডাউন ২ সপ্তাহ বাড়াতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে চরমভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে আমরা সবকিছু স্বাভাবিক করে দিচ্ছি। এ কি স্রেফ আত্মহনন নয়?
লকডাউন তুলে নেয়ার পিছনে জাতীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সক্ষমতাকে সামনে ঢাল হিসেবে আনা হচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতি সুরক্ষার যে স্তোত্র এখন আওরানো হচ্ছে তা নিছকই অন্ধের হাতী দর্শনের মতো বিভ্রমে ভরা। আমরা সম্ভবত ভবিষ্যতের এক ফুট দূরত্ব দেখতেও সামর্থহীনতার পরিচয় দিচ্ছি। একটি জনগোষ্ঠী যদি ব্যাপকভাবে করোনাক্রান্ত হতে থাকে, মানুষ যখন তার চার পাশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে দেখবে, যখন অসংখ্য মৃত্যু দর্শন করবে, চিকিৎসাহীন আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠবে; তখন ওই জনগোষ্ঠী কি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতে পারবে? তখন তো অনাক্রান্তরা উদভ্রান্ত হবে নিজেকে বাঁচাতে। আর রপ্তানী? কোন দেশ কি ব্যাপকভাবে সংক্রমিত দেশের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখবে? আসবে এই দেশে ? পণ্য নিবে?
আমাদের সরকার প্রধানকে হয়তো কেউ সঠিকভাবে ভবিষ্যৎ অবস্থা বুঝাচ্ছেন না অথবা আদৌ বুঝানোরই কোনো চেষ্টা করছেন না। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখন এমন পর্যায়ে নেই যে, বৈদেশিক উপার্জন তিন মাস বন্ধ থাকলে দেশে দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। নারায়নগঞ্জের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান আবেগমথিত কিছু কথাবার্তা বলেছেন টিভি টক শোতে। তাঁর কথার সারমর্ম এই যে, বাংলাদেশে অন্তত এক কোটি স্বচ্ছল লোক আছেন যারা প্রত্যেকে অন্তত ৫টি পরিবারের তিন মাসের খাদ্যের দায়িত্ব নিতে সক্ষম। তার মানে এই এক কোটি লোক দেশের ৫ কোটি পরিবার তথা কমপক্ষে ২০ কোটি লোককে নিদেনপক্ষে তিন মাস বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। সংসদ সদস্যের কথার মধ্যে বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি নেই। গত তিন বা চার দশকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি, শ্রম শোষণ, ব্যবসা বাণিজ্য করে পয়সাওয়ালা লোক কম হয়নি। এদের বিবেক জাগ্রত করা গেলে পুরো বাংলাদেশকে তিন মাস নয়, এক বছরই খাদ্য জুগিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাষ্ট্রের সামর্থের বাইরেই এই সম্ভাবনা। আমরা জানি, চোরা কভু নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী। মিষ্টি কথায় হয়তো এই ধনাঢ্যদের টাকশালের দরজা খুলা যাবে না। রাষ্ট্র যদি এই জায়গায় একটু কঠোরতা দেখায়ই তা তো অন্যায় হবে না। পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তীরণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করা সম্ভব যে কৃষি ব্যবস্থা; সেটি তো রয়েছেই। সুতরাং জীবিকার কথা বলে করোনা ভাইরাসকে নিমন্ত্রণ করে এনে পাত পেড়ে খাওয়ানোর যুক্তিটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
দুর্যোগ দুর্বিপাকের সুযোগ গ্রহণ করে সুবিধা নেয়ার লোক থাকে। এই অমানবিক মানুষদের হাতেই থাকে ক্ষমতার চাবি। এরাই প্রভাবিত করে রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে। দেশে দেশে আজ সব সরকারকে, বিশেষ করে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে এই মুনাফা লুটা রক্তচোষা বেনিয়াদের প্রভাব অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে মানবিক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এই বৈশ্বিক মহামারীর মাঝেও আজ যুদ্ধের হুমকি শুনা যায়। নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে এরই মাঝে। এই করোনা মহামারীই ডেকে আনতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। অর্থনৈতিক মহামন্দা আটকাতে সাম্রাজ্যবাদের হাতে যুদ্ধই প্রধান হাতিয়ার। আজ তারই অশুভ বিলয় সুর বেজে উঠেছে। বৈশ্বিক আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে বাঁচতে পুরো পৃথিবীকে আজ একাট্টা হতে হবে মানবিক মন্ত্রে। নতুবা মাটি পড়ে থাকবে কিন্তু সেখানে মানুষ থাকবে না। পুড়ামাটি নীতি যুদ্ধ জয়ের উন্মাদনা হতে পারে, কিন্তু সৃজনশীল মানুষের অভিপ্রায় কখনও এ হতে পারে না।
বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই করোনার এই উর্ধমুখী চরম ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেয়ার পরিনামহীন চিন্তা ভাবনা থেকে সরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে কোভিড ১৯ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। নেই এর কোনো কার্যকর ঔষধ। এই সাংঘাতিক ছোঁয়াচে ভাইরাসের ছোবল থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। প্রকৃতি এখন চঞ্চল, তাই ভাইরাসটিও সংহারী মূর্তি ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতির উদার নিয়মেই এটি সময়ের ব্যবধানে দুর্বল হবে। এরই মাঝে বিজ্ঞান নিয়ে আসবে প্রতিষেধক ও কার্যকর দাওয়াই। ততদিন সময় আমাদের দিতেই হবে। তা না করে প্রকৃতির উপশমদায়ী অঙ্গে এই ভাইরাসকে দুর্বল হতে না দিয়ে যদি শরীরে ধারণ করে জীবিত ও প্রলয় তৈরির শক্তি অক্ষত রাখতে দেই তাহলে প্রাকৃতিক নিয়মের সুফল লাভ থেকেও আমরা বঞ্চিত থাকব। উদগ্র লোভের বশবর্তী হয়ে গেলে তলেমূলে সবকিছু খোয়াতে হবে।
সৈয়দ আব্দুল হাদির গানের একটি লাইন–সময় থাকতে মনা হুশিয়ার। অর্থাৎ তিনি সময় থাকতে মানুষকে হুশিয়ার হতে বলেছেন। নতুবা সময়ের এক ফোড় অসময়ের দশ ফোড় হয়ে আমাদের বিদ্ধ করবে আর আমরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাব গোষ্ঠীশুদ্ধু।


