মরতুজা আহমদ
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হওয়ার অন্যতম দাবীদার সুনামগঞ্জে ০৪ (চার) লোককবি স্মরণে হাওর পাড়ের গল্প ২০১৭ শিরোনামে চার দিনব্যাপী লোক উৎসব আয়োজনের জন্য সুনামগঞ্জবাসী, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিকে সাধুবাদ জানাই। বাউল স¤্রাট শাহ্ আব্দুল করিম, মরমী কবি হাছন রাজা, লোক কবি রাধারমণ দত্ত, দূবর্বীণ শাহ স্মরণে এবারের আয়োজনে যেমন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা তেমনি এর শিরোনামের যথার্থতা সকলের দৃষ্টি কেড়েছে।
প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্রের অপূর্ব লীলাভূমি সুনামগঞ্জের হাওর। প্রকৃতির মতই সরল এখানকার মানুষের জীবন। নদী, হাওর, বাওর বেষ্টিত এ জনপদ আবহমান কাল ধরে সৃষ্টি করেছে সুরের দ্যোতনা। হিজল করচ, পারিজাই পাখি আর জীব বৈচিত্র্যের আঁধার – ভাটির এ জনপদ নিজেদের সংস্কৃতির পাশাপাশি আমাদের জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাকে আলোকিত করেছে।
মারেফতি বা ফকিরালী গানের পোশাকী নাম মরমী সাহিত্য। এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন মরমী কবি হাছন রাজা, শাহ্ আব্দুল করিম, রাধারমণ দত্ত, দূবর্বীণ শাহ্, সৈয়দ শাহনূর, সৈয়দ হোসেন আলম, কালাশাহ, ছাবাল শাহ, এলাহী বক্স মুন্সী, শাহ্ আছদ আলী, পীর মজির উদ্দিন, আফজল শাহ, শীতালং শাহ্, আরকুম শাহ, আজর আলী, আশু শাহ্, মাহমুদ শাহ্, উদাসী বাউল শাহ্, হাসিম আলী, রিয়াছ আলী, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, সুরম্নজ আলী, ক্বারী আমির উদ্দিন, আব্দুল আজিজুর রহমান চৌধুরীসহ অসংখ্য বাউল যাঁদের সৃষ্ট গানের ধারায় এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বেগবান ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। তবে নীরবে নিভৃতে লালনেরও জন্মের আগে থেকে বৃহত্তর সিলেট বিভাগে বাউল ফকিরদের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ধারা যেভাবে এগিয়ে চলেছিল কোন কারণে সেটা গবেষকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গবেষণার কাজটি করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিলেটে সপ্তদশ শতকে (১৭৩০ থেকে ১৮৫৫) সৈয়দ শাহনূরসহ অন্যরা সে চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন।
ভাটি বাংলার নিসর্গ হত দরিদ্রদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে তাদের দ্যোতনা এবং সুরের মায়াবি বন্ধনের মাধ্যমে মানুষের চিত্তে সুখ, দু:খ, আনন্দ-বেদনার ফোয়ারা বইয়ে দিয়েছেন সুনামগঞ্জের জননন্দিত সমৃদ্ধ কবি সাহিত্যেকেরা। তাঁদের সৃষ্ট বাউল গান, সারি গান, জারি গান, বিয়ের গান, মালজোড়া বা কবি গান, ভাটিয়ালী গান, ঘেটু গান, কীর্তন, গাজীর গান, ধামাইল আমাদের এ অঞ্চলকে এক বিশেষ উচ্চতায় আসীন করেছে। লোক সঙ্গীতের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে ধামাইল গান।
যে মৃত্তিকার ঘ্রাণে, যে নদীর ¯্রােতে, যে আকাশের নীলে এবং যে উর্বর মাটি শুধুই ভড়ষশষড়ৎব এর কথা বলে তারই নাম সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ লোক সাহিত্যের এক সমৃদ্ধ জনপদ। ১৪০০ সাল থেকে এ অঞ্চলে সিলেটি নাগরী থেকে এক লিপির উদ্ভব ঘটে এবং এ লিপির ভাষায় লিখিত হয় বিপুল সংখ্যক ইসলামী গ্রন্থ, পুঁথি-পইসহ অনেক গজল, কবিতা, ডাক-ডিঠান, ধাঁধাঁ-ছিলক, জারী ইত্যাদি বাংলা লোক সাহিত্যের আওতাভুক্ত।
লোক উৎসবের আলোচনার অন্যতম মূল ব্যক্তি দূবর্বীণ শাহ্। কবির প্রতিটি গান কাল থেকে কালান্তরে টিকে থাকবে আপন মহিমায়। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক (১৯২০ খ্রিস্টাব্দ এর ২ নভেম্বর) ছাতকের সুরমা নদীর উত্তর পারে নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন দূবর্বীণ শাহ্। সঙ্গীতচর্চার একটা পারিবারিক ঐতিহ্যেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর অধিকাংশ গানে সুফি ও মরমীবাদ যথেষ্টভাবে ফুটে উঠলেও এসবের বাইরে ভিন্ন মেজাজের অসংখ্যক গান লিখেছেন। শ্রেণী বিভাজন করলে এসব গানগুলোকে বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ, মিলন, রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী, হামদ-নাত, মারফতি, পীর-মুর্শিদ স্মরণ, আল্লাহ্ স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি স্মরণ, ভক্তিগীতি, মন:শিক্ষা, সফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, দেশের গানসহ বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। ‘আমি জন্মে জন্মে অপরাধী তোমারই চরণে রে’; ‘নির্জন যমুনার কূলে বসিয়া কদম্বতলে’; ‘আমার অন্তরায় আমার কলিজায়’; ‘সুখের নিশি প্রভাত হলো উদয় দিনমণি’; ‘শমন লইয়া পিয়ন খাড়া আর কত দিন দেরি’; ‘ছাড়িয়া যাইও না বন্ধু রে, কৃপাসিন্ধু দীনবন্ধু নামটি তোমার সংসারে’ সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর অনবদ্য অবিনাশি গীতিমালাতে ইলমে মারফত, ¯্রষ্টার প্রেম, পলীর চিরায়ত রূপ স্পষ্ট ভেসে উঠে। যেমন, মুর্শিদ ছুরতে খোদা বর্তমান/ খোদে- খোদা আদমজাদ পয়দা সুরতে ইনসান। তাঁর গানের সুরে বাংলার মানুষের আনন্দ বেদনা, হাসি কান্না প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে তাঁর প্রতিটি গান যেন হাওর পাড়ের একটি গল্প।
দূবর্বীণ শাহ্ এবং আব্দুল করিম এক সাথে মঞ্চ মাতাতেন, সে কথা জানি আমরা। বিভিন্ন গ্রামে মালজোড়া গান গেয়ে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। সুনামগঞ্জের গৌবর দূবর্বীণ শাহ্ বাংলাদেশের একজন মরমী গীতিকবি, বাংলা লোক সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার, বাউলসাধক। ১৯৭৪ সালে কলকাতায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক তাঁর যুক্তি তক্কো আর গল্পো চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছিলেন বাউলসাধক দূবর্বীণ শাহের লেখা ‘নমাজ আমার হইল না আদায়’ শীর্ষক গানটি। ঢাকায় উৎসব প্রকাশন থেকে লোকসাহিত্যের গবেষক সুমন কুমার দাশ সম্পাদিত ‘দূবর্বীণ শাহ্ সমগ্র’ বইয়ে দূবর্বীণের সকল রচনাসম্ভার স্থান পেয়েছে।
এ সাধক- বাউলের গান প্রাণবান ও অসামান্য। দূবর্বীণ শাহ্ ১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালীদের আমন্ত্রণে বিলেত গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর গানের কথা ও সুরে বিমোহিত হয়ে সঙ্গীত প্রেমীরা তাকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। অথচ লালন, রাধারমণ, হাছন রাজা কিংবা শাহ্ আব্দুল করিমের গান যেভাবে এপার-ওপার দুই বাংলার বাঙালিদের কাছে পৌঁছছে সে তুলনায় দূবর্বীণ শাহ্’র গান এতটা পৌঁছেনি। অথচ তাঁর গানের ভাষায় বিশেষত্বে ও স্বত:স্ফূর্ত উপস্থাপন শ্রোতাদের গভীর আনন্দের খোরাক যোগায়। তিনি যেমন একদিকে গানের রচয়িতা ও গায়ক ছিলেন তেমনি অন্যদিকে নিজের গানের সুরারোপও করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর গান চিত্তবিনোদনের খোরাক যোগালেও এসব গানের মর্মকথা স্বতন্ত্র দর্শন হিসেবে বিভিন্ন পরিসরে ছড়িয়ে গড়ছে। গণ মানুষের গান গেয়ে গণ সংগীতকে তুমুল জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন দূবর্বীণ শাহ।
‘বৈদেশ থেকে ঋণ আসিলে মোদের ভাগ্যে পড়ে না’- ১৯৭০ সালে একটি গানে এমন কথা বলেছিলেন বাউলসাধক দূবর্বীণ শাহ্। তখন ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ। অখন্ড পাকিস্তান রাষ্ট্রে যখন দিনের পর দিন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দু:খ- শোক- জরা- শোষণ-নির্যাতনের শিকার, তখনই তাঁর এমন উচ্চারণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগুনঝরা প্রতিবাদের সমর্থনেও তাঁর গান রচিত হয়েছে-
‘কেন ঘুম ভাঙে না মোদের কেন ঘুম ভাঙে না
জাগো জাগো বাঙালি ভাই নিদ্রায় রইলে আর চলে না’।
স্বাধীন বাংলাদেশে দূবর্বীণ শাহ্ নতুন গান লেখেন-
‘সোনার বাংলা হইল রে স্বাধীন,
বাংলাদেশ হইল জয়
দূরে গেল দস্যু জাতির ভয়’।
‘বাংলার পতাকা আমার বাংলার পতাকা
সবুজের মধ্যে সূর্য শহীদের খুনে মাখা’।
দূবর্বীণের গানের ভাষা বাংলা তবে উর্দু, হিন্দী, ফারসি, ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছেন। যেমন: ইয়া মোহাম্মদ সারওয়ারে আলম তুম হ্যায় মেরে গড কি ফ্রেন্ড। দূবর্বীণের গানে যেমন রয়েছে কোরান হাদিসের কথা তেমনি রয়েছে পুরাণ মহাভারতের উদৃতি। কবি আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তাঁর অনন্য সৃষ্টি কর্মের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। আর এজন্য আমাদের দায়িত্ব রয়েছে অনেক।
হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শাহ্ আব্দুল করিম আর দূবর্বীণ শাহ্ মরমী সাধনার সাথে মানুষের প্রাণের ভাষা মিশিয়ে উদ্বেলিত করছেন সব বাঙালিকে। সুনামগঞ্জের গৌরব এই চার সাধক এভাবেই হয়ে উঠেছেন গোটা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিমূল। সুনামগঞ্জের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণ মানুষের আশা আর প্রত্যাশাকে জাগ্রত করার রাজনৈতিক চেতনাও পরিপুষ্ট হয় এ সাধকদের গানের সুরে। লাখো বাঙালির রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল সবুজের বাংলাদেশ এবং এ দেশের মাটি ও মানুষের সমৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে এ অবসান অনস্বীকার্য। সুনামগঞ্জের এ কৃতি সন্তানদের অবদানকে আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, করবো চিরকাল।
হাওর পাড়ের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, গল্পের শেষ টানব হাওর দিয়ে। সুনামগঞ্জের হাওরের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতির অনেক পুরনো ইতিহাস। নিজস্ব লোকগতি এবং কবিতা ছাড়াও এর রয়েছে বিভিন্ন ভাষা এবং রীতির চর্চা – এখানকার ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি ও বাঁশির সুর। গ্রীষ্মে হাওড়ের যে অংশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয় বর্ষায় সেখানে থাকে মাথা সমান পানি। হেমন্তে যে জায়গায় হালচাষ করে কৃষকেরা, বহু কষ্টে ফসল ফলায়, ভরা বর্ষায় সেখানটাতেই জেলেদের উত্তাল টেউয়ের সঙ্গে বুক চিতিয়ে পথ চলতে হয়। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালের সাথে লড়াই করে জীবন চলে। প্রকৃতির জোয়ার ভাটায় জীবন হয় নিত্য প্রভাবিত। তাই প্রকৃতির আপন খেয়ালেই এখানে কথা তৈরি হয়, গান সৃষ্টি হয়। এখানে বার মাসে তের পার্বণে ভরপুর হিন্দুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তাদের রয়েছে বিভিন্ন মেলা ও উৎসব যা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনকে করেছে আরও রঙিন। মুসলিম সম্প্রদায়ের রয়েছে গাজীর গীত, মহররমের গান, মর্সিয়া, কাওয়ালী, কবিগান, জারী, সারি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি। এখানকার জনপ্রিয় লাঠি খেলা, নৌকা দৌড়ের রেশ এখনও শেষ হয়নি। ধামাইল হিন্দু- মুসলমান সকলের গান। থিয়েটার, নাটক, যাত্রা আর কবি গানের লড়াইতো আছেই। দুর্গাপূজা, মনসা পূজা, কালীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠানে ঢপযাত্রা পরিবেশিত হয়, যা এখানকার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। একতারা, ডুগডুগি, করতাল, ঢোলের শব্দ এখানে নিত্য ঢেউ তোলে, রক্তে কল্লোল জাগায়। প্রকৃতি তার আপন প্রয়োজনেই গান ফলায়। হাওরের ঢেউয়ের সাথে ওঠে গানের ঢেউ। ভাটির মানুষ গান ভালবাসে, ভালবাসে গানের ভাও রপ্ত করে নিতে। আর তাই এখানকার সাধকদের সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি এ দেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ এদেশ।
লেখক: সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়


