অধ্যক্ষ মোঃ ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক
প্রস্তাবিত ছাতক-সুনামগন্জ রেললাইনের এ্যালাইনমেন্ট দীর্ঘ সমীক্ষা ও জরীপ শেষে ছাতক সদর থেকে দোয়ারাবাজার উপজেলার বঙ্গবন্ধু বাজার (শিবপুর) হয়ে সুনামগঞ্জ সদর পর্যন্ত (২৭ কি.মি ) নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি প্রায় দ্বিগুণ (৪৪ কি.মি) দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট নতুন আর একটি এ্যালাইনমেন্টের জরীপ দক্ষিণাংশের সিলেট-সুনামগঞ্জ হাইওয়ে সংলগ্ন (আফজলাবাদ-দক্ষিণ খুরমা- শান্তিগঞ্জ-সুনামগঞ্জ) পরিচালিত হওয়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে বহুল বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। পরবর্তীতে গোটা সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার যোগাযোগ বিস্তৃতির জন্য মোহনগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবং শিল্প শহর ছাতকের সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে সিমেন্ট, পাথর, বালি, চুনা ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রী দ্রুত, সহজে ও নিরাপদে ভাটি অঞ্চলের সর্বত্র পরিবহনের জন্য সুনামগঞ্জের ৫ জন মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় পূর্ব জরীপ অনুযায়ী অর্থাৎ উত্তরাংশের ছাতক সদর- বঙ্গবন্ধু বাজার (শিবপুর)-সুনামগঞ্জ সদর পর্যন্ত এ্যালাইনমেন্ট বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় রেলমন্ত্রী মহোদয়কে অনুরোধ পত্র দিয়েছেন। দোয়ারাবাজার উপজেলার বাসিন্দা হিসাবে আমার অবস্থান স্বাভাবিক ভাবেই পূর্বের জরীপের অর্থাৎ ভায়া বঙ্গবন্ধু বাজার লাইনের পক্ষে। তারপরও রেলপথের মত একটি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ের সূদুরপ্রসারী মানব কল্যাণের প্রসঙ্গে চিন্তা করে পূর্বের ও পরের এদুটি এ্যালাইনমেন্ট সম্পর্কে আমার নিজস্ব যুক্তিপূর্ণ মতামত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন মনে করি।
প্রস্তাবিত ছাতক – সুনামগঞ্জ রেলপথ পরবর্তীতে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখেই পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অতীত ইতিহাস, বর্তমান বাস্তবতা ও ভবিষ্যত প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে যথার্থ যাচাই-বাছাই করে সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য। ছাতক-ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে লাইনের মাধ্যমে ছাতকে অতি দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে ভাল মানের পাথর আনার ব্যবস্থা রয়েছে। ছাতকের সিমেন্ট, পাথর, বালি, চুনা ইত্যাদি নির্মাণ সামগ্রী সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে সহজে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুততার সাথে বাংলাদেশ রেলওয়ে পৌঁছে দিচ্ছে। সুবিধাগুলো হাওরাঞ্চলের সুনামগঞ্জ – নেত্রকোনা জেলা দুটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী নাগরিকদেরও পাওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে বলেই জেলার ৫ জন মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় এব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। কিন্তু গত ০৭ ফেব্রুয়ারী তারিখের দৈনিক সমকাল পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানা যায় যে, এরই মধ্যে পরবর্তী প্রস্তাবের পক্ষে রেল মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ প্রেরণ করা হয়েছে। সেজন্যে বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করার জন্য মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয় ও মাননীয় রেলমন্ত্রী মহোদয় সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
উপর্যুক্ত আলোচনার সূত্র ধরে “ছাতক সদর – দোয়ারাবাজারের বংগবন্ধু বাজার (শিবপুর) – সুনামগঞ্জ সদর” অর্থাৎ পূর্বের জরীপের এ্যালাইনমেন্ট বাস্তবায়নের পক্ষে নিম্নোক্ত যুক্তি সমূহ তুলে ধরছিঃ
(১) এর জরীপ ইতিপূর্বেই সম্পন্ন হয়েছে বিধায় নতুন ভাবে জরীপ করার প্রয়োজন হবে না।
(২) এতে রেলপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ২৭ কি.মি হবে বিধায় অনেক ব্যয় সাশ্রয়ী হবে।
(৩) এপথে উঁচু ভূমি থাকায় নির্মাণ কাজ সহজ ও টেকসই হবে।
(৪) এপথে প্রয়োজনীয় ভূমির বাজার মূল্য তূলনামূলক ভাবে অনেক কম হবে।
(৫) এপথে নদী, খাল, বিল খুবই কম থাকায় সহজে নির্মাণ যোগ্য হবে।
(৬) শিল্প শহর ছাতক ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এবং ভোলাগঞ্জ ও ছাতকে দূরদূরান্তের (সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ইত্যাদি জেলার) শ্রমিকের যাতায়াত বেশী বিধায় নিয়মিত যাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি হবে।
(৭) ছাতক সদর থেকে সিমেন্ট, বালি, পাথর, চুন, সবজি, প্রাণীসম্পদ ইত্যাদি দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন করে সুনামগঞ্জ সদরে ও ভাটি অঞ্চলে পৌঁছানো যাবে।
(৮) একই ভাবে ভাটি অঞ্চলের পণ্য ধান ও মৎস্য সম্পদ ছাতকসহ সারা দেশে দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে পরিবহন করা যাবে।
(৯) ছাতকে বাংলাদেশ রেলওয়ের অনেক অবকাঠামো ও জমি রয়েছে বিধায় স্থাপনার ব্যয় অত্যন্ত কম হবে।
(১০) এতে যোগাযোগ বিহীন উত্তরাঞ্চলের জনগণ সুবিধা পাবেন এবং সরকারি সুযোগের সুষম বণ্টন হবে।
অপরপক্ষে ‘আফজলাবাদ-দক্ষিণ খুরমা-শান্তিগঞ্জ-সুনামগঞ্জ’ অর্থাৎ নতুন জরীপের মাধ্যমে সিলেট-সুনামগঞ্জ হাইওয়ে সংলগ্ন রেলপথ নির্মাণের এ্যালাইনমেন্টের বিপক্ষে কয়েকটি যুক্তি উত্থাপন করছিঃ
(১) এক্ষেত্রে নতুন ভাবে আবার জরীপ করতে হবে যাতে অতিরিক্ত ব্যয় হবে।
(২) দৈর্ঘ্য ৪৪ কি.মি অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ হবে বিধায় রেললাইন নির্মাণ অধিক ব্যয়বহুল হবে।
(৩) বেশীরভাগ জমি নিচু হওয়ায় রেলসড়ক অনেক উঁচু করতে হবে।
(৪) সিলেট-সুনামগঞ্জ হাইওয়ে সংলগ্ন অধিকাংশ লন্ডন প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত বিধায় ভূমির বাজার মূল্য তূলনামূলক ভাবে অনেক অনেক বেশি হবে।
(৫) অনেক নদী, খাল, বিল, হাওর ইত্যাদি থাকায় অসংখ্য ব্রিজ নির্মাণ করতে হবে।
(৬) হাইওয়ে সংলগ্ন বিধায় অধিকাংশ মানুষ সড়ক পথে চলে যাবে এবং ট্রেন যাত্রীর সংখ্যা কম হবে।
(৭) পণ্য পরিবহন তূলনামূলক ভাবে অনেক অনেক কম হবে বিধায় রেলওয়ের আয় কম হবে।
(৮) ভাটি অঞ্চলের পণ্যের বাজারও ব্যবসাসফল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে।
(৯) সম্পূর্ণ নতুন ভাবে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জংশন স্টেশন নির্মাণের প্রয়োজন হবে।
(১০) এতে যাদের পাশে হাইওয়ে আছে এবং রেলপথের তেমন একটা প্রয়োজনীয়তা নাই তাদের পাশেই রেলপথ নির্মাণ হবে, যার ফলে সরকারি সুযোগের একপেশে বন্টন হবে।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সর্বক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান সজ্জন রাজনীতিবিদ মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী আলহাজ্ব আব্দুল মান্নান অপচয় পছন্দ করেন না এবং সরকারি সুবিধার সুষম বণ্টন চান। মাননীয় সংসদ সদস্যগণও অনগ্রসর জনপদের যোগাযোগ সুবিধা বাড়াতে চাইছেন। সুতরাং সকলের লক্ষ্য একটাই। তাই বিভক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়-দায়িত্বের ভার-বোঝা এককভাবে কাঁধে নেয়া ঠিক হবে না। “দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”। ঐক্যবদ্ধভাবে শ্রদ্ধাভাজন নেতৃবৃন্দের গৃহীত সিদ্ধান্তই হবে সর্বোত্তম। এ ব্যাপারে মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয়গণ অগ্রসর হলেই একটি সঠিক ফয়সালা হবে এমনটাই জেলাবাসী আশা করেন।
এমতাবস্থায় সার্বিক ভাবে জনকল্যাণ সাধনের জন্যে উত্থাপিত যুক্তিসমূহ পরীক্ষা নীরিক্ষা ক্রমে এবং আরও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি বিবেচনায় নিয়ে সূদুরপ্রসারী চিন্তা করে জনকল্যাণমুখী, ব্যয়সাশ্রয়ী, টেকসই ও লাভজনক একটি সুফলা পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য মাননীয় রেলমন্ত্রী মহোদয়ের সুদৃষ্টি আকর্ষণ সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি এবং এক্ষেত্রে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী জনাব এম এ মান্নান মহোদয়ের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি। এমন জনগুরুত্ব সম্পন্ন একটি জাতীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই সম্পূর্ণ বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে যাতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কল্যাণ সূচিত হয়। উপকার ভোগী মানুষেরা সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণকারীকে চিরদিন স্মরণে রাখে।


