এড. রুহুল তুহিন
হাওর পাহাড়ী ছোট্র জনপদ সুনামগঞ্জের বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে আমরা বুঝতাম সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ। স্কুল ও কলেজ জীবনের বিস্তর পার্থক্য একজন কলেজ ছাত্রকে দেখলেই বুঝা যেতো। আর যেসব অগ্রজ ছাত্র -ছাত্রীরা মেডিকেল, বুয়েট, ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেতেন তারা ছিলেন উদাহরন যোগ্য। সঙ্গত কারণেই সকলের সম্মান ও ¯েœহের পাত্র ছিলেন তারা। অনুজরা গর্বভরে সম্মান করতেন তাদের। একটি মফস্বল শহরের আধুনিকতার দিকে বিকশিত হওয়ার প্রারম্ভিক পর্যায়ে শহরের উপকন্ঠ থেকে আমাদের বেড়িয়ে আসা ছিলো নানা দিক থেকেই রোমাঞ্চকর।
কলেজে ভর্ত্তি হওয়া বা এস.এস.সি পাশ করার পূর্ব থেকেই কয়েকজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের নাম শুনতাম অভিভাবকদের কাছ থেকে। তাদের অনেকের মধ্যে একটি নাম ছিলো জনাব মো:আব্দুল বারী, আমাদের প্রিয় বারী স্যার । অত্র অঞ্চলে সবার কাছে তিনি “বাবার বাড়ীর” স্যার নামেই পরিচিত ছিলেন।
তৎকালীন সময়ে প্রত্যন্ত ও অখ্যাত একটি গ্রাম “নীলপুর” বারী স্যারের কারণেই গোটা সুনামগঞ্জে পরিচিত পায়।
“বাবার বাড়ী” যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিলো হাতে বাওয়া নৌকা। নৌকা দিয়ে নীলপুর বাজারে আসা তারপর সুনামগঞ্জ শহরে আসা বা অন্য কোনো দিকে যাওয়া। শ্রদ্ধেয় বারী স্যার শিক্ষা জীবন থেকে শিক্ষকতা জীবনের একটি সময় এভাবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা যাওয়া করেছেন। এভাবে কষ্ট করে করেই তিনি সবার প্রিয় বারী স্যার হয়ে উঠেছিলেন। বারী স্যার ও আমার গ্রামের বাড়ী ও একই ইউনিয়নে। তরুণ বয়সে বারী স্যার এই এলাকার অসংখ্য তরুণের মধ্যে রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়াশুনায় উৎসাহ বৃদ্ধি ও মানসিক ভাবে উজ্জিবিত করার জন্য বারী স্যারকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতেন। বারী স্যারের কারণে এই এলাকার অনেক ছাত্র শহরের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনায় করে কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
আমাদের গ্রামীন জীবনে বারী স্যার একটি আদর্শ ও আলোক বর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে উঠেছিলেন।আমি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্ত্তি হওয়ার মৌখিক পরীক্ষায় আমার বোর্ডের দায়িত্বে ছিলেন বারী স্যার। প্রথমে একটু ভয় পেলে ও বারী স্যারের সহজ সরল আন্তরিক ব্যবহার আমার ভয় দূর করে দেয়। কলেজ জীবনের পরবর্তী সময়ে বারী স্যার হয়ে উঠেছিলেন আমাদের একটি ভরসার জায়গা।
বিনম্র শ্রদ্ধায় বারী স্যারের মহানুভবতাকে আমরা স্মরণ করছি। বারী স্যার শিক্ষক হিসেবে ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল শিক্ষক।
কলেজে তখন ইতিহাসের একজন শিক্ষকই ছিলেন। বারী স্যার ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে প্রতিটি বর্ষের ক্লাস একাই নিতেন। প্রতিদিন চার পাঁচটি ক্লাস নিতো হতো স্যারকে , ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করতেন না বা কখনো ও অধৈর্য্য হতেন না।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাহিরে বারী স্যার প্রাইভেট টিউশনি বা অন্য কোনো ভাবে উপার্জনের চেষ্ঠায় নিজেকে কখনো যুক্ত করেন নি। ইতিহাস বিষয়ের বাহিরে ও ভালো ইংরেজী জানতেন তিনি।
কিন্তু স্যার শিক্ষাকে ব্যবসার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেন নি। শিক্ষাকে মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। স্যারের এই আদর্শিক অবস্থান আজকের সমাজের জন্য একটি অনুকরনীয় দৃষ্ঠান্ত।
কলেজ থেকে একবার আন্ত:কলেজ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমাদেরকে এম.সি কলেজ সিলেট-এ পাঠানো হলো।
বিতর্ক প্রতিযোগিতাটি কুমিল্লা বোর্ড কর্তৃক আয়োজন করা হয়েছিল। আমাদের গ্রুপ প্রধান ছিলেন মিথুন দা (লম্বা বাসার)।
উপস্থিত বত্তৃতা প্রতিযোগিতা দীর্ঘায়িত হওয়ায় অতিরিক্ত একদিন আমাদেরকে সিলেট অবস্থান করতে হয়েছিল। কলেজ থেকে একদিনের খরচ দেওয়া হলে ও অন্য একদিনের খরচ কলেজ থেকে না পাওয়ায় বারী স্যার নিজ পকেট থেকেই আমাদেরকে প্রদান করেছিলেন।
আশির দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব উত্তপ্ত ছিলো । স্বৈরাচার বিরোধী বা সাম্প্রদায়িকতা বিরোধ আন্দোলন খুব জোড়ালো হয়ে উঠেছিল। প্রায় প্রতিদিনই ছাত্র সংগঠন গুলোর মিছিল মিটিং থাকতো। ছাত্ররা বা ছাত্র নেতৃবৃন্দ যখনই কোনো অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন বারী স্যার ছাত্রদের পাশে দাড়িে য়ছেন। আমাদের কলেজ জীবনের একটা সময়ে ছাত্রদেরকে বা ছাত্র নেতৃবৃন্দকে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হয়েছে। বারী স্যার প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের পক্ষে না দাড়িয়ে ছাত্রদের দাবির পক্ষে যতটুকু সম্ভব অবস্থান গ্রহন করেছেন। বারী স্যারের এই সৎ সাহস তৎকালীন ছাত্র নেতৃবৃন্দকে সাহস যুগিয়েছে। বারী স্যার কলেজ নির্বাচন সময়ে সবসময় কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্যার কখনো ও কোনো বিতর্কের জন্ম দেন নি বা স্যারকে নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি।
বারী স্যার শুধু একজন শিক্ষকই ছিলেন না অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে ও কার্পন্য করেন নি। বারী স্যার তার এলাকার অনেক গরিব ছাত্র ছাত্রী, মাদ্রাসার ছাত্র বা আতœীয় স্বজনকে পড়াশুনার ক্ষেত্রে অসামান্য সহযোগিতা প্রদান করেছেন। তারা প্রত্যেকেই বারী স্যারের এই অবদানের কথা স্বীকার করেন। বারী স্যার একটি সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে ও চিন্তা ও মননে ছিলেন সহজ সরল ও পারিবারিক প্রভাবে প্রভাবিত। গৃহস্থ ঘরের একজন মানুষের সমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ তার মধ্যে ছিলো অবারিত ভাবে। নীতি নৈতিকতার দিক থেকে ছিলেন দৃঢ়, প্রথাগত ও সাবলীল।
বারী স্যারের বিস্তৃত জীবনে কোনো অনৈতিকতার ছাপ ছিলো না। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পারিবারিক জীবনে বারী স্যার কোনো অনৈতিক বা অনাদর্শিক চিন্তা ও কর্মকে কখনো পশ্রয় দেন নি। বারী স্যার শিক্ষক হিসেবে, অধ্যক্ষ হিসেবে, মানুষ হিসেবে গৃহস্ত মানুষের মতোই ছিলেন উদার, সহজ সরলও মানবিক চিন্তায় সমৃদ্ধ একজন মানুষ। আমার প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যু পরবর্তী জীবন আরো শান্তিময় হোক।
লেখক: আইনজীবী ও কবি।
- প্রধানমন্ত্রী বরাবরে ব্রিটিশ বাংলাদেশী কার্গো ব্যবসায়ীদের স্মারকলিপি
- শিক্ষাবিদ মো. আব্দুল বারী আর নেই


