ফসলহানি বাড়ছেই-লাখ কৃষকের স্বপ্ন ভাঙছে

বিশেষ প্রতিনিধি
দেখতে দেখতে সুুনামগঞ্জের হাওরবাসীর স্বপ্ন ডুবছে। ২০ বছর আগে একবার চৈত্রমাসের প্রথম দিকে জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল নষ্ট হয়েছিল। ২০ বছর পর আরেকবার চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারী বর্ষণ, পাহাড়ীঢলে বাঁধ ভেঙে, কোথাও কোথাও মাটি না ফেলা বাঁধ উপচে বা ক্লোজার দিয়ে পানি ঢুকে প্রায় ১৫ লাখ কৃষকের স্বপ্ন ভেঙেছে। কৃষকরা বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-অবরোধ শুরু করেছেন।
রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার ছোট-বড় হাওরের মধ্যে ৪২ টি হাওর হয় বাঁধ ভেঙে, না হয় ডুবরায় ডুবে গেছে। এই হাওরগুলো হচ্ছে- তাহিরপুরের মহালিয়া, বলদা, লোভা, ঘোলঘাট, গইন্নাকুড়ি, নজরখালি, মিথ্যাডুবা, ঘুরমার বর্ধিতাংশ ছনার হাওর। ধর্মপাশার ধারাম, টগা, বোয়ালা, সালদিঘা, হামলাদিঘা, মারদারিয়া, ডুবাই, ঘুরমা, পাসুয়া ও মেঘনার হাওর। শাল্লা উপজেলার বরামের একাংশ ও বাঘারবন্দ হাওর। ছাতকের নাইন্দা, জল্লার, বাঙাডিঙা, চাপতি ও সুরির হাওর। জগন্নাথপুরের বৃহৎ নলুয়ার হাওর। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পাখিমারা, জামখলা, চিত্রাকান্দা ও দেখারহাওরের একাংশ। দোয়ারাবাজার উপজেলার বন্দেহরি, নাইন্দা, ছাতল, বড়হাওর, ছনুয়া, দিঘা, মাইগাকুনা, জঙমারা, নলুয়া,         
লগিমারা, কাকিআইল, লাইম ও কনছখাই হাওর। এই সবকয়টি হাওরে স্থানীয় কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী ২৮ হাজার ২০০ হেক্টর ফসল ডুবেছে। বাকী হাওরগুলোর ডুবে যাওয়া ঠেকাতে প্রাণপণ লড়াই করছেন কৃষকরা। এদিকে, রোববার সকালে শিলা-বৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমার উত্তর পাড়ের সুরমা ও জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের সবজী ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
রোববার সকাল ও দুপুরে জেলার সর্ববৃহৎ দেখার হাওরের দিঘদাইড়, উতারিয়া ও টোলাখালি স্লুইসগেট দিয়ে পানি ঢুকে হাওরের জমি ডুবতে শুরু হয়েছে। বিকালে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার জিরাক তাহিরপুর বাঁধ ভেঙে জেলার আরেক বৃহৎ হাওর খরচায় পানি ঢুকা শুরু হয়েছে।
এই বাঁধের ভাঙনের পাশে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে পানির শব্দ শুনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হাওরপাড়ের রাধানগর গ্রামের কৃষক বলছিলেন, ‘ভাই পানির শব্দ আমার মোবাইলে শুনুন, সা সা শব্দে আমাদের বুকের পাঁজর ভাঙছে। বাঁধের কাজ আগে হলে এমন হতো না।’
খরচার হাওরপাড়ের কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক কাজল বর্মণ বলেন,‘২০ বছর আগে একবার ফাল্গুনের শেষ সময়ে জলাবদ্ধতায় ফসল ডুবেছিল, ২০ বছর পর আরেকবার এমন অসময়ে ভারী বর্ষণে নদীর পানি টইটুম্বুর এবং হাওরে পানি ঢুকা দেখছি। ফসল পাকা শুরু হলে কিছু ধান কেটে আনা যায়। কিন্তু এখন ধান যেভাবে আছে, কেটে এনে কোন লাভ হবে না।’
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (সন্ধা ৬ টা) বাঁধের ভাঙন ঠেকানোর জন্য বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া সুলতানা জিরাক তাহিরপুর বাঁধে ছিলেন।
তানিয়া সুলতানা বললেন,‘৩০০০ হেক্টরের মতো ফসল ডুবে গেছে। তবুও আমরা চেষ্টা করছি, ঠেকানো যায় কী-না’। কেবল জিরাক তাহিরপুরে বাঁধে নয় রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই চিত্র ছিল জেলাজুড়ে।
এদিকে, রোববার দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত কয়েক দফায় সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে বিক্ষোভ করেছে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা। প্রথম দফায় বিএডিসির একটি স্লুইসগেট সময়মত মেরামত না করায় দুপুর ১২ টায়  সড়ক অবরোধ করে নীলপুরে বিক্ষোভ করে কৃষকরা। দ্বিতীয় দফায় পাউবো’র বাঁধের কাজে অনিয়ম হওয়ায় পাগলা বাজারের পাশে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কৃষকরা। বিক্ষুব্ধ হাওরের বাঁধ নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদার ও পাউবো কর্মকর্তার গ্রেপ্তারও দাবি করেছেন।  
জেলা কৃষি সম্প্রসারণে উপ-পরিচালক জাহেদুল হক জানিয়েছেন, জেলায় বড় হাওর ৪৮ টি। ডুবেছে ৩০ টি। বেশিরভাগই বড় হাওর। ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর।
সুনামগঞ্জ পাউবো’ নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিন রোববার দুপুরে বললেন,‘ডিজাইন লেবেলের ৩ ফুট বেশি পানির উচ্চতা হওয়ায় এই পর্যন্ত ৯ টি হাওর ডুবেছে। স্থানীয় কৃষকগণসহ আমরা সকলে মিলে অন্য ঝুঁকিপুর্ণ হাওররক্ষা বাঁধের ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টায় আছি’।