বহু ঘাত-প্রতিঘাত চক্রান্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেও ১৯৫৯ সনে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এ পর্যন্ত ৫৭ বছর যাবৎ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পিছনে নেতৃত্ব ও অনুপ্রেরণাদানকারী মহান বিপ্লবী কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ত্রো ৯০ বছর বয়সে শুক্রবার স্থানীয় সময় ১০ টা ২৯ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেছেন। সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিকটবর্তী একটি দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ক্যাস্ত্রো জীবিত থাকতেই প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। আজীবন এই বিপ্লবী কঠোর সংগ্রাম আর কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে গণমানুষের মুক্তির জন্য সংগঠিত বিপ্লবটিকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। বয়সজনিত অক্ষমতার কারণে ২০০৮ সনে কিউবা বিপ্লবের তৃতীয় নেতা আপন ছোট ভাই রাউল ক্যাস্ত্রোর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি নিভৃত যাপন যাপন করছিলেন। এই মহান বিপ্লবীর প্রয়াণে সারা বিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বিশ্বনেতৃবৃন্দ, মানবমুক্তির সংগ্রামে নিয়োজিত নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ ব্যাপক শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা যখন কঠিন সংকটে পতিত হয় যখন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো একে একে প্রতিবিপ্লবে ভেঙে খানখান হয়ে পড়ছিল যখন সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী বাঘাবাঘা নেতা ভোল পালটিয়ে পূঁজিবাদী শিবিরে নাম লেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন যখন কিছু দেশে সমাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা বহাল রেখে পূঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় নাক ডুবিয়ে ফেলছিলেন ঠিক সেসময়ও মহান ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিউবায় সমাজতন্ত্রের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছেন। সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কাছে অশেষ শ্রদ্ধার এই মহান নেতার প্রয়াণে আমরা গভীর শোকাহত। তাঁর অম্লান স্মৃতির প্রতি রইলো আমাদের অনিঃশেষ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।
জীবিত থাকা অবস্থায় ক্যাস্ত্রো ৬৩৮ বার হত্যা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন বলে বলা হয়। সা¤্রাজ্যবাদী পরাশক্তি তাঁকে নিয়ে কতোটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও ভীত ছিলো সেটি বুঝাতে এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু কিউবান কমিউনিস্ট পার্টির অনমনীয় দৃঢ়তার কারণে প্রতিটি চক্রান্তই ব্যর্থ হয়। কিউবায় বিপ্লব সংগঠনের পর থেকে অদ্যবধি দেশটি পূঁজিবাদী বিশ্বের কঠিন প্রতিরোধ ও বিরোধিতা এবং অবরোধের মধ্যে রয়েছে। এতদসত্বেও কিউবার জনগণের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থান এমনসব মৌলিক বিষয়াদির নিশ্চয়তা করেছিল দেশটি। শিক্ষিতের হার প্রায় শতভাগ। ওই দেশে অনাহারে কেউ থাকেন না, কোন ব্যক্তিই গৃহহীন নয়। সকলের চিকিৎসা করা হয় রাষ্ট্রীয় ভাবে। এতোসব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করলেও বর্হিবিশ্বে ক্যাস্ত্রোকে চিত্রায়িত করা হয় একজন হিং¯্র স্বৈরশাসক হিসেবে। এটি যেমন করা হয়েছিল স্ট্যালিনের ক্ষেত্রে যেমন করা হয়েছিল মাওসেতৃংয়ের বিরুদ্ধে তেমনি ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ক্যাস্ত্রো এমনসব কথা নির্ভয়ে ও অবলীলায় বলতেন যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সবগুলো পূঁজিবাদী রাষ্ট্র সবসময় সন্ত্রস্থ থাকতো। ১৯৭৩ সনে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের সময় তাঁর মন্তব্য ছিলো বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ক্যাস্ত্রো তখন বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। সদ্য স্বাধীন এ্ই দেশটি নিয়ে ক্যাস্ত্রোর ছিল বিশেষ আগ্রহ। তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রতিবিপ্লবী চক্রান্ত বিষয়ে সাবধানও করে দিয়েছিলেন।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল কাঠামোটিকে গণমুখী রাখতে সমাজতন্ত্রের বাইরে এখন পর্যন্ত আর কোন দর্শনের উদ্ভব ঘটেনি। এমন একটি কল্যাণকর আদর্শকে টিকিয়ে রেখে ক্যাস্ত্রো সারা বিশ্বের জন্য যে আদর্শ রেখে গেছেন আজ তার চর্চা করাই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানের সর্বোত্তম পথ। আসুন ক্যাস্ত্রোর জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে শোষণ, বঞ্চনা, মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিচল প্রয়াসে সকলে নিয়োজিত হই।

