বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিকাতর সুনামগঞ্জবাসী

বিশেষ প্রতিনিধি
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকীর দিনে সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু’র আগমন নিয়ে স্মৃতিকাতর অনেকেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আলাপচারিতায় সোমবার অনেকেই বঙ্গবন্ধু’র স্মৃতিচারণ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জে সাত, আবার কেউ বলেছেন আটবার এসেছিলেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য সিরাজুল ইসলাম বঙ্গবন্ধু’র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,‘১৯৭০’এর নির্বাচনের আগে সম্ভবত. ফেব্রয়ারি-মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে এসে জনসভায় ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। জগন্নাথপুর থেকে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা পায়ে হেঁটে এসেছিলাম। পাগলাবাজারে এসে আমরা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই বঙ্গবন্ধু সিলেটের হামিদ মিয়া ও ইসমাইল মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে একটি জীপে করে পাগলায় এসে পৌঁছান। পাগলায় অসংখ্য মানুষ তাঁকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল, তিনি সেখানে নামেন এবং আমরা সকলে স্লোগান ধরি। ওই দিন সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে পরিবহন ধর্মঘট থাকায় আমরা ট্রাকে করে সুনামগঞ্জে এসে পৌঁছাই। কিন্তু ওই সমাবেশে এতো জমায়েত ছিল, পরে আসায় কাছেই ভিড়তে পারি নি। দূর থেকেই বঙ্গবন্ধু ভাষণ শুনেছি।
দিরাইয়ের রাজনীতিবিদ অমর চাঁন দাস বঙ্গবন্ধু’র স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন ৭০’এর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু দিরাই এসেছিলেন। তাঁকে দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ নৌকায় কালনীর পাড়ের হাইস্কুল মাঠে সমবেত হয়েছিলেন। যারা নৌকায় ভোট দেননি, তাঁরাও বঙ্গবন্ধুকে দেখা ও তাঁর বক্তৃতা শুনতে এসছিলেন। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা বাস্তবায়নে নৌকায় ভোট দেবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অবশ্য ওই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন ন্যাপের সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত।
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম নবী হোসেন বলেন, ৭০’এর নির্বাচনের আগে আমরা তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। এমএল মাসুদ লঞ্চে বঙ্গবন্ধু এসে বেলা ২ টার দিকে নামেন। হাজার হাজার মানুষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। বাজারের উত্তরপাশে মঞ্চ করা হয়েছিল, তিনি ঘণ্টা দেড়েক সমাবেশে ছিলেন। দীর্ঘ বক্তৃতায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নানা বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। বক্তৃতা শেষে তিনি বাঙালির নতুন স্লোগান নিজেই ধরেন, তিনি ‘জয়বাংলা স্লোগান তোলার পর হাজার হাজার মানুষ তাঁর কণ্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে জয়বাংলা স্লোগান দেন। পরে আওয়ামী লীগের থানা সভাপতি রহমান সাহেবের লঞ্চের অফিসে গিয়ে নাস্তা সেরে বিকাল সাড়ে ৪ টায় গোলকপুরের দিকে রওয়ানা দেন।
মুক্তিযোদ্ধা আসাদ উল্লাহ্ সরকার জানালেন, বঙ্গবন্ধু ভৈরব থেকে লঞ্চে সুনামগঞ্জ আসার পথে সেলিমগঞ্জে নেমেছিলেন। ওখানে তাঁর পিতা সাফিজ উদ্দিন সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বসান, তিনি হাজারো মানুষের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত ভাষণও দেন। দেশ স্বাধীন হবার পর তাঁর বাবা সাফিজ উদ্দিন সরকার, স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ডা. দেলোয়ার হোসেন এবং তিনি ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধু’র সঙ্গে দেখা করে এই স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে সেলিমগঞ্জের ওই স্থানে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে দেবার জন্য বঙ্গবন্ধু’র কাছে আবদার করেন। পরে ওখানে সোনারবাংলা হাসপাতাল নামে একটি হাসপাতাল করা হয়। যা এখন ১০ শয্যার একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান’এর লেখা ‘বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দু’দিন ইতিপূর্বে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭, ৬৬, ৬৯, এবং ১৯৭০ এবং ৭৩ ও ৭৪ ইংরেজিতে অর্থাৎ ৭ বার সুনামগঞ্জ এসেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু’র সঙ্গে লঞ্চযোগে নির্বাচনী প্রচারণায় সঙ্গী ছিলেন বলে দাবি করেন।
যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট কল্লোল তালুকদার চপল বঙ্গবন্ধু’র সুনামগঞ্জ আগমন, সমাবেশে ভাষণ এবং কোথায় কোথায় অবস্থান করেছিলেন এই নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে পত্র-পত্রিকা এবং নানা ছবি থেকে বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জে ৮ বার আসার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৭০’এর নির্বাচনের আগে মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে এসে তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী’র হাসননগরের বাসভবনে ওঠেন এবং ১৯৫৬ ও ৬৪ সালে সুনামগঞ্জে এসে তৎকালীন ডাকবাংলোয় ওঠেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র, সুনামগঞ্জ’এর আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু জানালেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু সুনামগঞ্জের ষ্টেডিয়ামে সভা করেছেন। সারা মাঠে মানুষ আর মানুষ। তারপরে লঞ্চে করে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন থানা সফর করেছেন, কিন্তু মানুষের ভিড়ের জন্য সব সময়ই দূর থেকেই তাঁর ভাষণ শুনতে হয়েছে। ১৯৭৩ সালে সুনামগঞ্জে আসলেন। সাথে তৎকালীন পররাষ্টমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ এবং অভ্যন্তরিণ নৌ ও জাহাজ চলাচল মন্ত্রী আতাউল গণি ওসমানি। বঙ্গবন্ধুর হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার জন্য হেলিপ্যড করা হয়েছে মল্লিকপুরে। তিনি তখন দৈনিক পূর্বদেশের সুনামগঞ্জস্থ সংবাদদাতা থাকায় একটি সিকুউরিটি পাস পেয়েছিলেন। মল্লিকপুরে হেলিপ্যাডে গেলেও খুব একটা কাছে যেতে পারেননি।