ড. জয়া সেনগুপ্তা এমপি
বঙ্গবন্ধুর সাথে স্মৃতি আমার খুব সামান্যই। তারিখটা ঠিক মনে করতে পারছি না। গণজাগরণের জোয়ারে তখন সারা পূর্ব পাকিস্তান ভাসছে। এই জাগরণের অধিনায়ক সারা পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুরর রহমান- (তিনি তখনও বঙ্গবন্ধু আখ্যায় ভূষিত হননি।)
ফরিদপুরের একটি থানা শহর ভাঙা (বর্তমানে উপজেলা)। বিভিন্ন গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ সেদিন ছুটে এসেছে ভাঙায়। দলমত নির্বিশেষে যাঁর ডাকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ একতাবদ্ধ হয়েছে সেই অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আসছেন। আমার বাবা ওকালতি পেশায় তাঁর সব ব্যস্ততা ভুলে বাড়ির গেইট খুলে রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন একনজর সেই নেতাকে দেখবার জন্য। আমি রাস্তার পাশের বৈঠকখানার জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। সুঠাম দেহী সুদীর্ঘ অত্যন্ত সুপুরুষ নেতা আসলেন- পরনে শ্বেতশুভ্র পায়জামা ও পাঞ্জাবী। তিনি এসে স্মিত মুখে বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন- হাত মিলালেন। পরক্ষণে তাঁর দৃষ্টি পড়ল অবগুন্ঠনবতী আমার মায়ের দিকে। হাত তুলে সালাম জানালেন আমার মাকে। মুগ্ধ আমার দুটি চোখ- অভিভূত আমি। কোনদিন কোন বড় জাতীয় নেতাকে এত কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর এই অমায়িক ব্যবহার একই সাথে বাবা-মা এবং আমাকে অভিভূত ও নির্বাক করে দিল।
এর পরের ঘটনা বাংলাদেশ স্বাধীন হবার অব্যবহিত পরের। আমার স্বামী তখন সংসদ সদস্য। হঠাৎ করেই একদিন তিনি দুপুরে সংসদ থেকে ফিরে আসলেন। অল্প কিছু পরেই একটি টেলিফোন এল। রিসিভারটি তুলতেই কোনরকম সম্বোধন ছাড়া একটি বজ্্রগম্ভীর কন্ঠ উচ্চারিত হল “ওরে পাঠাইয়া দাও”। ঘটনার আকস্মিকতায় এবং অসাধারণ গম্ভীর সেই কন্ঠস্বরের প্রভাবে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রিসিভার হাতে নিয়েই দাঁড়িয়েছিলাম। বলাবাহুল্য সেই বজ্্রকন্ঠের আদেশের কোন উত্তরও আমি দিতে পারিনি। আমার স্বামী আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে টেলিফোনটি সম্পর্কে বারবার জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। তারপর সব শুনে তাঁর সেই স্বভাবসিদ্ধ উচ্চ কন্ঠের হাসি হেসে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। যেতে যেতেই আমাকে বললেন, সংসদে আমাকে কথা বলার সুযোগ দেননি। আমি ডধষশ ড়ঁঃ করেছি। বঙ্গবন্ধু আমাকে হাউজে ফিরে যেতে বলেছেন। পরে শুনেছিলাম বঙ্গবন্ধু তাকে পরম ¯েœহে কাছে ডেকে নিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘ তোর যখনই ইচ্ছা, তুই কথা বলবি। তুই-ই আমার বিরোধী দল।’
এরপর বেশ কিছুদিন চলে গেছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার মেয়ের বিয়েতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ আমার স্বামী আমার কাছে এসে বললেন ‘বঙ্গবন্ধু এসেছেন- দেখা করবে এস।’ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই অত্যন্ত ¯েœহ ভরা উচ্চারণে বললেন ‘ভাল আছ?’ এর আগে বহুবার রেডিওতে তাঁর বজ্্রকন্ঠের ঘোষণা শুনেছি “এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তাছাড়া আমি নিজেই একদিন টেলিফোনে তাঁর কন্ঠস্বর শুনে ভেবেছিলাম ‘এমনও গম্ভীর কন্ঠস্বর হয়!’ সেই কন্ঠস্বরই ¯েœহের উচ্চারণে এত কোমল-এমন ¯িœগ্ধ শোনাতে পারে-এওকি সম্ভব! সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে যে কথাটি শ্রদ্ধাভরে বারবার মনে মনে উচ্চারণ করেছিলাম, আজ বহু যুগ পরেও সেই কথাটিই আবার পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি- পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি রবীন্দ্রনাথের লেখা শেষ সঙ্গীতটির সেই বিখ্যাত চরণটি-
“ ব্যক্ত হোক, তোমা মাঝে
অসীমের চির বিস্ময়।”
লেখক : সংসদ সদস্য, সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা)


