বছরে ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি
তাহিরপুর, বড়ছড়া, চারাগাঁও শুল্কস্টেশন দিয়ে ভারতের মেঘালয়ের কয়লা অনিয়মিতভাবে নামায় এবং ভারতের কয়লার মূল্য বেশি থাকায় ভারতীয় কয়লা আমদানী করতে আগ্রহী হারিয়ে ফেলছেন এই তিন বন্দরের আমদানী কারকরা। একারণে প্রায় ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অন্যদিকে, ভারতীয় কয়লাও বাজার হারাচ্ছে, এই স্থান দখল করছে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ইন্দোনেশিয়ার কয়লা।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের ৩ শুল্ক বন্দরে প্রায় ৬০০ আমদানী কারক কয়লা আমদানী করেন। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় কয়লা শুল্কস্টেশন এগুলো। শুল্কস্টেশন চালু থাকলে কমপক্ষে ৫০ হাজার শ্রমিক এসব বন্দরে কাজ করেন। ২০১৪ ইংরেজি’র ১৩ মে থেকে এই শুল্কবন্দরগুলোর দুর্দিন যাচ্ছে। বেশিরভাগ সময়ই এই বন্দরগুলো দিয়ে কয়লা আমদানী হয় নি। একারণে এই উপজেলাসহ জেলা শহর সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোণা জেলা শহরেও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে। কয়লা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা সচল না থাকায় এই দুই জেলা শহরে জমি-জমার মূল্যও কমে গেছে।
ভারতের মেঘালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন ডিমাহাসাও জেলা ছাত্র ইউনিয়নের আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৪ ইংরেজির ১৭ এপ্রিল ন্যাশনাল গ্রীণ ট্রাইব্যুনাল (এনজিটি) মেঘালয় সরকারের অবৈধ কয়লা খনন ও পরিবহন বন্ধের নির্দেশ দেন। একই বছরের ৬ মে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় মূখ্যসচিব এব্যাপারে প্রতিটি জেলায় নির্দেশ জারি করেন। গ্রীণ ট্রাইব্যুনালের এই নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয় মেঘালয়ের জেলা প্রশাসকদের। এ কারণে ২০১৪ ইংরেজির ১৩ মে থেকে মেঘালয়ের সীমান্ত জেলাগুলোয় ১৪৪ ধারা জারি করে কয়লা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
এরপর থেকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় শুল্কবন্দর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বড়ছড়া-চারাগাঁও ও বাগলী দিয়ে কয়লা আমদানী বন্ধ হয়ে যায়।
রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই করে প্রথমে উত্তোলিত কয়লার রাজস্ব জমা দিয়ে ৩ মাস (এপ্রিল, মে ও জুন’২০১৫) রপ্তানীর সুযোগ পান। পরে এই সময় ৫ দফায় বাড়িয়ে গত প্রায় ৫ বছরে ২৩ মাস উত্তোলিত কয়লা রপ্তানী হয়।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তোলিত কয়লা রপ্তানীর সুযোগ দেয়। অথচ. এই সুযোগ কোন প্রকার নোটিশ বা চিঠি ছাড়াই ১৫ জানুয়ারি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর আবারও রপ্তানীকারকরা আইনী লড়াই শুরু করেন। গত ১০ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৩১ মে পর্যন্ত উত্তোলিত অবশিষ্ট কয়লা রপ্তানী’র সুযোগ দেয়। ৩রা জুলাই ভারতের সুপ্রিমকোর্ট কয়লানীতি অনুসরণ করে কয়লা উত্তোলনের আদেশ দেন। অর্থাৎ পরিবেশ দোষন না করে বৈজ্ঞানিক পন্থায় কয়লা উত্তোলন করা। উপজাতীয়দের জমিতে কয়লা খনি থাকলে, তারাই এটি’র মালিক থাকবে বলে নির্দেশে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ডিসেম্বর মাসের ১৭ তারিখ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত কয়লা আমদানী চালু ছিল। রপ্তানী কারকরা উত্তোলিত অপসনকৃত কয়লা মৌখিক চালানের ভিত্তিতে রপ্তানী করছেন।
তাহিরপুর কয়লা আমদানী কারক গ্রুপের সদস্য সচিব রাজেশ তালুকদার জানান, ভারতীয় কয়লা প্রতি টনের আমদানী মূল্য এখন প্রায় ১০ হাজার টাকা, পরিবহন খরচসহ কেনা পড়ে প্রায় ১১ হাজার টাকা। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার কয়লা ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায় কিনে দেশীয় ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন আমদানী কারকরা। নিয়মিত কয়লা আমদানী না হওয়ায় এবং ভারতীয় কয়লার মূল্য বেশি থাকায় আমদানী কারকরা ভারতীয় কয়লা আমদানীতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বাজার দখল করছে ইন্দোনেশিয়া কয়লা। তাহিরপুরের তিনটি সম্ভাবনাময় শুল্কবন্দরও অকার্যকর হবার পথে। এই বন্দরগুলোতে গত কয়েক বছরে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব কম পাচ্ছে সরকার।
রাজেশ জানালেন, উত্তোলিত কয়লা অপসন করে রপ্তানী করার আদালতের সিদ্ধান্তও কার্যকর হতে বিলম্ব হচ্ছে। কয়লা উত্তোলনও শুরু হচ্ছে না। গত নভেম্বর মাসে মেঘালয়ের মূখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমা সিলেটে এসে বলেছিলেন, শীঘ্রই বাংলাদেশে ভারতীয় কয়লা রপ্তানী শুরু হবে। আড়াই মাস পার হবার পরও এই বিষয়ে অগ্রগতি কম। এখন যে কয়লা আসছে, এটি কত দিন চালু থাকবে, এটাও বলা যাচ্ছে না। অনিশ্চয়তা সকল পর্যায়ে থাকায় আমদানী কারকরা ভরসা পাচ্ছেন না।
তাহিরপুর কয়লা আমদানী কারক গ্রুপের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের জানালেন, কয়লা রপ্তানীতে ভারতের উচ্চ আদালতের কোন নিষেধাজ্ঞা আমাদের জানামতে এখন আর নেই। সুতরাং রাজ্য সরকারসহ যাদেরকে আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন, তারা কয়লা উত্তোলন এবং রপ্তানীতে আন্তরিক হলে রপ্তানী কারক এবং আমদানী কারক দুই পক্ষেরই সুবিধা হয়।
তাহিরপুর কয়লা আমদানী কারক গ্রুপের সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বলেন, দুই দেশের সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে কয়লা আমদানী-রপ্তানী স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি আমরা। এতে করে শুল্কবন্দর গুলোতেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।