মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন
জীবন সবচেয়ে মূল্যবান। তাই বেঁচে থাকা প্রয়োজন সবার আগে। বৈশ্বিক মহামারী করোনা তো আছেই, এর সাথে এ সময়ে আমাদের এ এলাকার আরেক বিপদ বজ্রপাত বা বজ্র ঝড়ে মৃত্যু। গেল ১৮ মার্চ জেলায় একদিনে ৪ জনের প্রাণহানী হয়েছে বজ্রাঘাতে। বছরের মার্চ থেকে মে আর সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় আমাদের দেশে। ভৌগোলিক কারণে দেশের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় আমাদের সুনামগঞ্জে। এতে প্রাণহানিও ঘটে সবচেয়ে বেশি। কারণ কৃষি প্রধান এই হাওরাঞ্চলে এ মৌসুমে মানুষ ঘরে বসে থেকে পারে না। পর্যাপ্ত লাইটেনিং এরেস্টার স্থাপন করা গেলে এ থেকে হয়তো নিরাপদ থাকা যেত। কিন্তু এটি এখনো এতই ব্যায়বহুল যে আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে সর্বত্র এটা স্থাপন এখনো প্রায় অসম্ভব। তাই কিছু ব্যক্তিগত সাবধানতা অবলম্বন করা ছাড়া বজ্রপাত থেকে বাঁচার কোন উপায় নাই।
গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত বজ্রপাত মোকাবেলায় সহনশীল জনগোষ্ঠী গঠনের লক্ষ্যে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে প্রায় ৬০০ অংশগ্রহণকারীর জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব, জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সনসহ বিভাগের অন্যান্য অধ্যাপকবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দ, জেলার ৩০টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকবৃন্দ।
দেশ বিদেশের আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের সাথে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা ও তত্ত্বের ভিত্তিতে ‘বজ্রপাত থেকে বাঁচতে জরুরি নির্দেশনা সমূহ -‘ শিরোনামে আমি যে কর্মপত্র উপস্থাপন করেছিলাম তার সার সংক্ষেপ আমি এখানে উপস্থাপন করছি।
আমি মনে করি এ সময় প্রতিটি নাগরিকের এই বিষয় সমূহ মাথায় রেখে চলা উচিৎ।
নির্দেশনা সমূহ –
১. এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করুন।
২. বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।
৩. খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান।
৪. কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।
৫. খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। গাছ থেকে চার মিটার দূরে থাকতে হবে।
৬. বজ্রপাতের ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না।
৭. প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন নিশ্চিত করুন।
৮. ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকতে হবে। বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।
৯. ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।
১০. যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
১১. বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় থাকবেন না এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন।
১২. ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন।
১৩. উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।
১৪. বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
১৫. কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।
১৬. বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন।
১৭. বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন।
১৮. বজ্রপাতের সময় গাড়ির মধ্যে অবস্থান করলে, গাড়ির থাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না। সম্ভব হলে গাড়িটিকে নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
১৯. বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।
২০. বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকে মতো করেই চিকিৎসা দিতে হবে।
বজ্রঝড়টির অবস্থান আপনার থেকে কত দুরে আছে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন। বিজলী চমক দেখার এবং বজ্রধ্বনি শােনার মাঝে সময়ের ব্যবধান দ্বারা। বিজলী দেখা ও শব্দ শোনার মধ্যে সময় ব্যবধান
০৫ সেকেন্ড হলে বজ্রঝড়টি ০১ মাইল দূরে/১.৬৬কি.মি. দূরে,
১০ সেকেন্ড হলে ০২ মাইল দূরে /৩.৩৩ কি.মি. দূরে,
১৫ সেকেন্ড হলে ০৩ মাইল দূরে /০৫ কি.মি. দূরে,
২০ সেকেন্ড হলে ০৪ মাইল দূরে/ ৬.৬৬কি.মি. দূরে,
২৫ সেকেন্ড হলে ০৫ মাইল দূরে /৮.৩৩ কি.মি. দূরে।,
৩০ সেকেন্ড হলে ০৬ মাইল দূরে /১০ কি.মি. দূরে।
যদি বজ্রঝড়টি আপনার এলাকা থেকে ৬ মাইল বা তারচেয়ে কম দূরত্বে থাকে তবে অবিলম্বে যে কোন মুহূর্তে আপনার দিকে মোড় নিতে পারে।
জীবন সবচেয়ে মূল্যবান। তাই আসুন আজই সচেতন হই। নির্দেশনা সমূহ মেনে চলি। নিরাপদ থাকি।
লেখক : সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি, সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ। ২২.০৪.২০২০


