বন্ধের পথে দুইটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়

বিশেষ প্রতিনিধি
উদ্যোক্তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সুনামগঞ্জের সম্ভাবনাময় দুইটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হতে চলেছে। অথচ দুইটি বিদ্যালয়ই দুই যুগেরও বেশি সময় আগে চালু হয়েছিল। বারবার বন্ধ, চালু করতে করতে এখন বিদ্যালয়গুলো কেবল সাইনবোর্ড সর্বস্ব অবস্থায় আছে। বিদ্যালয় দুটির একটি হচ্ছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের নোয়াগাঁওয়ের বামাচরণ নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
বামাচরণ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৯৫ সালের পহেলা জানুয়ারি এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময়ে বিদ্যালয়টির পাঠদান বন্ধ ও চালু হয়েছে কয়েকবার। আশপাশের ১৪ গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বিদ্যালয়টি স্থাপন করেছিলেন। এক পর্যায়ে এই প্রতিষ্ঠান ‘বামাচরণ’ না ‘চৌদ্দগ্রাম’ নামে হবে এই নিয়ে মতভিন্নতা দেখা দেয়। দুই পক্ষ দুই নামে বিদ্যালয় করার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করেন। নামকরণের এই দ্বন্দ্বে পিছিয়ে যায় স্কুলের সকল অগ্রগতি। পাঁচ মাস হয় বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ হয়ে আছে।
স্থানীয় তরুণ শ্যামল চন্দ্র দাস জানালেন, প্রতিষ্ঠানটি আশা জাগানিয়া ছিল। ১৪ গ্রামে কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। একারণে শুরু থেকেই অনেক শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বারবার বিদ্যালয় বন্ধ ও চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগেই বিদ্যালয়টি ‘চৌদ্দগ্রাম নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নামকরণ চান আবার কেউ কেউ চান ‘বামাচরণ নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। এই দ্বন্দ্বে গেল পাঁচ মাস হয় বিদ্যালয়ের পাঠদানই বন্ধ আছে। বিদ্যালয়টির দুই নাম দিয়ে দুই পক্ষ আলাদা আলাদা কাজ শুরু করেন। কিন্তু বামাচরণ নামেই কাজ এগিয়েছে বেশি। এজন্য এখন বামাচরণ নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামেই স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে সকলেই সম্মত হয়েছেন।
বামাচরণ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অন্যতম উদ্যোক্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা বিনোদ রঞ্জন তালুকদার বললেন, এলাকার বয়োজ্যেষ্টদের সিদ্ধান্তেই বিদ্যালয়টি আমার বাবার নামে নামকরণ হয় বামাচরণ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পরে কিছু তরুণ এর বিরুদ্ধাচরণ করে। কিন্তু অফিসিয়েলি বামাচরণ নামেই কাজ এগিয়েছে। বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত হবার প্রক্রিয়াটি বেশ এগিয়েছে। বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ হয় নি। এমপিও ভুক্তির জন্য বিগত বছরে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকা জরুরি ছিল। বাস্তবে ছিল ১০০ জন। এই বছর ছাত্র ভর্তির চেষ্টা করা হবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোবিন্দপুর নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৯৮৯ ইংরেজিতে প্রতিষ্ঠা হয়। এখানেও শুরুর দিকে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী ছিল। উদ্যোক্তাদের দ্বন্দ্বের কারণে এই বিদ্যালয়টিও আলোর মুখ দেখেনি।
বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম মাসুক বললেন, বিদ্যালয়টি ওয়াকপ স্টেটের একটি জলমহালের আয়ে চলতো। ওয়াকপ স্টেটের জলমহাল গ্রামের একটি পক্ষ ইজারা নেওয়ায় এটিও (বিদ্যালয়) বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে গ্রামে বহুদিন হয় দ্বন্দ্ব চলছে। গেল বছর এপ্রিল মাসে ঝড়ে স্কুল ভবনও ভেঙে গেছে। এখন গ্রামের শিক্ষানুরাগী মোশাহিদ আলম মাহিন তালুকদারের বাড়িতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণির ৩৪ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান হয়।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মোশাহিদ আলম মাহিন তালুকদার বললেন, আমি এই বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করেছি। পরে পড়াশুনার জন্য সিলেটে চলে যাই। পড়াশুনা শেষ করে এসে যখন বিদ্যালয়টি বন্ধ হতে দেখি, তখন ২০১৭ সালে এটি আবার চালু করার উদ্যোগ নেই। স্থানীয় সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ও এখানে আসেন, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ করে দেবার আশ^াস দেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ভবন নির্মাণের দরপত্রও হয়। গত এক বছর হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদার ধর্মপাশার বাসিন্দা মাইনুদ্দিন ভবনের কাজ শুরু করার আশ^াস দিচ্ছেন। কিন্তু কাজ করছেন না তিনি। এই অবস্থায় আমার বাড়িতেই ৩৪ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান হয়। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবন না দিলে, আমার নিজের উদ্যোগেই স্কুল ঘরের কাজ করবো।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বললেন, উদ্যোক্তাদের দ্বন্দের কারণেই সম্ভাবনাময় দুটি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ প্রায়। দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছি। এলাকায় যাবারও তারিখ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষকে বসানো যায় নি।