আসাদ মনি
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো। সেই সাথে বন্ধ রয়েছে শিক্ষকদের আয়ের পথও। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বৈশাখী বোনাস, ঈদ বোনাসসহ ঘরে বসেই সকল সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন। ডাক্তার, মসজিদের ঈমাম এমনকি কওমি মাদরাসাগুলোও সরকারি অনুদান পেয়েছে। কিন্তু কিন্ডারগার্ডেনের শিক্ষকরা কোনো সুবিধাই পাননি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বেশিরভাগ কিন্ডারগার্ডেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি অনুদান বা সাহায্য ছাড়াই শুধু অভিভাবকদের দেয়া বেতনে বছরের পর বছর পুরো জেলার কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হয়েছে। গত সাত মাসের অধিক সময় ধরে বন্ধ থাকায় টিউশন ফি (শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন) পাচ্ছে না এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। বকেয়া হয়ে গেছে বাড়ি ভাড়া। মানবেতর জীবন যাপন করছেন শিক্ষকসহ এর সাথে সম্পৃক্ত সকল কর্মচারী ও তাদের পরিবার। মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে পথে বসার আতঙ্কে রয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালকবৃন্দ।
শিক্ষকরা বলছেন, গেল এপ্রিল থেকে কোনো বেতন হচ্ছে না। শিক্ষকদের মাসিক বেতন অল্প হলেও টিউশন ও কোচিং পড়িয়ে চলেন তারা। বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় টিউশন ও কোচিং বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের বেতন বন্ধ থাকার সঙ্গে বাড়তি রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক কর্মচারী বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।
জেলার কিন্ডারগার্ডেন স্কুল সংগঠনের নেতারা বলছেন, মার্চ মাস থেকে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সব ধরণের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান চালাতে অনেক খরচ রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এপ্রিল মাস থেকে ভবনের ভাড়া দিতে পারেনি। এই সাত মাসে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ২-৩ লাখ টাকা ভবনের ভাড়া বাবদ ঋণ জমা হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বলছেন, বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় কোনো অভিভাবক বেতন পরিশোধ করেন নি। বেতনের জন্য চাপও দেয়া যাচ্ছে না। এজন্য আমরা শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না।
গৌরারং ইউনিয়নের সুরমা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের গণিতের শিক্ষক মো. কয়েস মিয়া বলেন, আগে বিদ্যালয়ের বেতন ও শিক্ষার্থীদের টিউশন পড়িয়ে পরিবার চালিয়েছি। এপ্রিল থেকে স্কুলের বেতন সহ টিউশন বন্ধ রয়েছে। কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। ঋণ-কর্জ করে চলেছি। এখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। কোনো উপায় না পেয়ে অন্য কাজ খুঁজছি।
ফিউচার কিন্ডারগার্ডেনের প্রিন্সিপাল রাজু আহমেদ বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে আমারও ৭ মাস ধরে বেতন হচ্ছে না। আমাদের পরিবার আছে তাদের নিয়ে কিভাবে সংসার চালাবো। সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রণোদনা পেয়েছেন। আমরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাইনি। পরিবার নিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
পৌর শহরের নতুন পাড়ার অবস্থিত ফারিহা একাডেমি। শিক্ষার্থী রয়েছেন ৪০০ জন। শিক্ষক রয়েছেন ২০ জন। প্রতিষ্ঠান চালাতে কর্মচারী রয়েছেন ১০ জন। প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলছিলেন, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের প্রতিষ্ঠান ভাড়া দিতে হয় না প্রতিমাসে। নিজেদের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত ফারিহা একাডেমি। জায়গার ভাড়া না দিয়েও প্রতিষ্ঠান চালাতে আমরা হিমসিম খেতে হচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে ৮০% অভিভাবক বেতন দিচ্ছেন না।
শিক্ষকদের বেতন কিভাবে দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে বেতন দিয়েছি শিক্ষক কর্মচারীদের। এরপর ১৫০০-২০০০ টাকা করে শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছি। এই টাকা কিছুই না। আমাদের শিক্ষক কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সরকারি সহযোগিতা না পেলে পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাওয়া কষ্ট হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এন্ড প্রি-ক্যাডেট স্কুল ফাউন্ডেশন সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং হলিচাইল্ড কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রিন্সিপাল মানিক মোহন চন্দ্র বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সরকারি ও এমপিও ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রণোদনা ও সহযোগিতা পেলেও আমাদের কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সংশ্লিষ্টরা কিছু পান নি। কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রাণ বলা হয় অভিভাবকরা। অভিভাবকরা প্রায় ৭ মাস ধরে বেতন দিচ্ছেন না।
এখন কিভাবে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, প্রতিষ্ঠান তো বন্ধ আছে। প্রতিষ্ঠানের বাসা ভাড়া সহ অন্যান্য খরচ সহ প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের ৪-৫ লাখ টাকা ঋণ হয়েছে। পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে আমাদের। তিনি দাবি জানান, কয়েকদিনের ভেতর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলো খুলে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করার।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মোশারফ হোসেন বলেন, কিন্ডারগার্টেন স্কুলের নেতারা উপজেলা নিবার্হী অফিসার বা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নি। ফলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা প্রণোদনা পেলেও তারা পাননি। এই জায়গায় তাদের ঘাটতি রয়েছে।
সহজ শর্তে ঋণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিন্ডারগার্ডেন স্কুল খুলে দেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এইটা প্রতিষ্ঠানগুলো সহকারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে ঋণ পাওয়ার জন্য। তারা যদি ঋণ পাওয়ার যোগ্য হয় পাবে। আমাদের কিছু করার নেই। সরকারি নির্দেশনা মতে শুধু কিন্ডারগার্ডেন বিদ্যালয় খুলে দেয়ার কোনো সম্ভবনা নেই।


