স্টাফ রিপোর্টার
টানা ১২ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৫০ টি এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ আছে। এরমধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে যাওয়ায় বন্ধ আছে শিক্ষা কার্যক্রম। তবে শিক্ষকেরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছেন জানিয়েছে শিক্ষা অফিস। যেসব বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকেছে, সেসব বিদ্যালয়গুলো বন্ধ আছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও ফাইল নিরাপদ উচ্চতায় রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিস।
জেলার তাহিরপুর, বিশ্বম্ভপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চলের হাজারো মানুষ বুধবার সকাল থেকে পানিবন্দী হয়ে আছেন। সড়ক-ঘরবাড়ি সরকারি-বেসরকারি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পানি ওঠায় বাধ্য হয়েই পাঠদান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বন্যার পানিতে পথ তলিয়ে যাওয়ায় অভিভাবকেরাও ঝুঁকি নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক স্কুল আছে যেগুলোতে নৌকা ছাড়া যাতায়াত করা যায় না। হাওর পাড়ি দিয়ে যেতে হয়, এমন অনেক স্কুলও আছে। এই অবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য হাওরে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ। পানি না কমা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে সন্তানদের পাঠাতে পারছেন না অভিভাবকেরা।
সুনামগঞ্জ শহরতলির পুরান লক্ষণশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাহিদা বেগম জানালো, ঘরে ঘণ্টা পানির উপরে, সড়কে কোমর পানি, স্কুল ঘরেও পানি, ঘরে থাকা দায়, বাইরেও বেরুনো যাচ্ছে না, স্কুলে যাবারই ব্যবস্থা নেই।’
একই গ্রামের শিক্ষার্থী অভিভাবক আব্দুল গফুর বললেন, গেল বন্যার ভোগান্তিতে একমাস পার হয় নি, আবার বন্যা, বাচ্চারা স্কুলে যেতে না পারায় পড়াশুনা বাড়িতেও করছে না, বন্যার পানিতে খেলাধুলা করায় জ¦র, ডায়রিয়াসহ অসুখ বিসুখ লেগেই আছে।
পুরান লক্ষণশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান তালুকদার বললেন, পাঁচ জন শিক্ষকের একজন বিপিএড’এ আছেন। আমরা চারজন বুধবার নৌকা নিয়ে স্কুলে গেছি, একজন শিক্ষার্থীও আসে নি। স্কুলের বেঞ্চ’এর উপর টেবিল ও আলমিরা ওঠিয়ে জরুরি কাগজপত্র, খাতাপত্র রেখেছি। আমাদের যাওয়াই কষ্ট, ছাত্ররা আসলে কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তাতে আরও বিপদ বাড়বে।
জেলায় সবচেয়ে বেশি নিমজ্জিত দোয়ারাবাজার উপজেলা। দোয়ারাবাজার উপজেলার শিক্ষা অফিসার অনুকুল চন্দ্র দাস জানালেন, উপজেলার প্রায় সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় ও সড়কে পানি উঠে গেছে। একারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে নিরুসাহিত করা হচ্ছে। উপজেলার ৩০ টি বিদ্যালয় পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় পাঠদান স্থগিত। ৪ টি বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তাহিরপুর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান শেখ জানান উপজেলার ১৩৪ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগই বন্যার পানিতে প্লাবিত। সড়ক, গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে পারছে না। ৪ টি প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে যাওয়ায় পাঠদান স্থগিত করা হয়েছে। অনেক স্কুলে ঘোষণা না দিলেও বন্যার কারণে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে।
একই ভাবে ছাতক ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার শিক্ষা অফিসার সুভাষ চন্দ্র চক্রবর্তী ও এনামুর রহিম বাবর বললেন, সড়ক ও বাড়িতে পানি থাকায় ৬০ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী নেই। শিক্ষার্থী আসলেও দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা আছে। তাই শুধু শিক্ষকরাই বিদ্যালয়ে আছেন। ছাতক উপজেলায় ১৮৫ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আসছে না। ৩ টি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করে আক্রান্তরা আশ্রয় নিয়েছেন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১৩০ টি বিদ্যালয়ের মধ্যে স্থগিত আছে ১৫ টি বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম আব্দুর রহমান বললেন, একদিকে নিয়োগ পরীক্ষার ঝামেলা অন্যদিকে বন্যা। পানি বিদ্যালয়ে ঢুকে গেলে পাঠদান স্থগিত করে এলাকাবাসীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য উপজেলা অফিসারদের নির্দেশনা দেয়া আছে। তারা তাদের প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, জেলায় কয়েকটি উপজেলার ১২ টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢোকার খবর পেয়েছি। প্লাবিত হওয়ায় সেগুলোতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।


