বিশেষ প্রতিনিধি
পৌরসভার নতুন পৌরকর নির্ধারণে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেছেন শহরের বিভিন্ন এলাকার হোল্ডিং মালিকরা। পৌরসভার নতুন পৌর কর নির্ধারণের অবগতির নোটিশে বেশিরভাগ হোল্ডিং মালিকের পুরাতন করের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি কর নির্ধারণ করায় হোল্ডিং মালিকরা (পৌরসভার বাসিন্দারা) দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। গত ৪ দিন ধরে একাধিক পৌর নাগরিক গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ফোন করে নতুন বর্ধিত কর দেখে তাদের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছেন। অবশ্য. পৌর কর্তৃপক্ষ শুক্রবার শহরে মাইকিং করে এবং স্থানীয় পত্রিকায় জনস্বার্থে বিজ্ঞাপন দিয়ে বলেছেন,‘পৌরসভা আইন-২০০৯ অনুযায়ী পঞ্চবার্ষিকী কর নির্ধারণের কাজ চলছে। কর নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সরকার নির্ধারিত হারে প্রাথমিক কর নির্ধারণ করে ভবন মালিকগণকে নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। কর রিভিউ কমিটিতে সম্মানিত করদাতাগণের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সহনশীল পর্যায়ে কর নির্ধারণ চূড়ান্ত হবে। পৌরবাসীর উপর বোঝা হয় এমন কোন কর আরোপ পৌর কর্তৃপক্ষ করবে না’।
পৌরসভার এমন প্রচারণায়ও সন্তুষ্ট হতে পারছেন না নাগরিকরা। পৌরসভা ম্যানুয়েলের তৃতীয় অধ্যায়ে কর নির্ধারণের যে পদ্ধতি রয়েছে, অনেকে বলেছেন নতুন কর নির্ধারণি প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে সেটি অনুসরণ করা হয়নি।
শহরের হাছননগরের বাসিন্দা সাবেক ভারপ্রাপ্ত পিপি অ্যাড. মাসুক আলম বলেন, ‘আমার দুইতলা বাড়ি’র পৌর কর ছিল ৩ হাজার টাকা। নতুন করে বাড়ি বড় করিনি। কিন্তু এবার পৌরসভা থেকে বাড়ির পৌরকর নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। যা কোনভাবেই স্বাভাবিক মনে হয়নি’। মাসুক আলম বলেন,‘পৌরকর বাড়ানোর চিঠি দেবার আগে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল একটা গণশুনানী বা পৌরবাসীর সাথে আলোচনা করা’। বাড়ির বর্ধিত পৌরকর দেখে উদ্বেগের কথা এ প্রতিবেদকে জানিয়েছেন শহরের ষোলঘরের বাসিন্দা সাবেক পিপি অ্যাড. ফারুক আহমদও।
শহরের পূর্ব নতুন পাড়ার বাসিন্দা কাজল চন্দ্র দে বলেন,‘আমার বাসার পৌরকর ছিল ৪৫০ টাকা। তবে আগে বাসাটি একতলা ছিল। নতুন করে বাসাটি দুই তলা করেছি। পৌরকর বাড়ানো হলে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারত। কিন্তু পৌরকর বহু গুন বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার ১৫২ টাকা। এত টাকা পৌর কর আমি কিভাবে দেব। কোন ভাবেই আমার পক্ষে এতবেশি টাকা পৌরকর দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের অনুরোধ মেয়র সাহেব পৌর করের বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে বাড়াবেন।’
শহরের ষোলঘরের বাসিন্দা পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের পৌর কাউন্সিলর সৈয়দ ইয়াছিনুর রশিদ বলেন,‘সবার মত আমারও পৌরকর বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগে আমাদের পৌরকর ছিল ৪০০ টাকা এবার নির্ধারণ হয়েছে ৪ হাজার টাকার উপরে। ’
শহরের বনানী পাড়ার বাসিন্দা মুক্তাদির আহমদ বলেন,‘গত বছর পৌর কর ছিল ৩শ’ টাকার একটু বেশি। কিন্তু এবার পৌরকরের কাগজ পেয়েছি ,তাতে ৫ হাজার ৫২ টাকা উল্লেখ রয়েছে। এত টাকা পৌরকর কিভাবে আমরা পরিশোধ করব। শুনেছি আমার একার নয়, সবারই কর বাড়ানো হয়েছে।’
পৌরসভার অ্যাসেসমেন্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০১১ সালের নির্দেশনা অনুযায়ি নতুন জেলা শহরের কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভবন বা এই ধরনের স্থাপনার ভাড়া নির্ধারণ হয়েছে ২ টাকা থেকে ৬ টাকা বর্গফুট। কিন্তু তারা এবার কর নির্ধারণের সময় ভাড়ার হার সুনামগঞ্জ শহরে ২ টাকা থেকে ৪ টাকার বেশি কোথাও ধরেননি। অর্থাৎ ১০০০ বর্গফুটের ভবনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া হিসাব করা হয়েছে এবং ঐ ভাড়ার ১৭ শতাংশ নতুন কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
শহরের পুরাতন বাসস্টেশনের বাসিন্দা অ্যাড. মাহবুবুল হাছান শাহীন বলেন,‘আইন কানুন নির্দেশনা যাই থাকুক, একসঙ্গে এভাবে করের বোঝা সহ্য করা কঠিন। গত বছর আমার কর ছিল ২৫৫৮ টাকা, এবার হয়েছে ৬৯ হাজার ৪৪১ টাকা। পৌর বিধি অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী পৌরসভার কর ও বর্ধিত কর যাচাইয়ের বিধান রয়েছে। এটি পৌর কর্তৃপক্ষ করেছেন কী না জানি না। এটি যাচাই করে এবং জনগণের সঙ্গে কথা বলে পৌর কর নির্ধারণ করলে ভাল হয়’।
শহরের তেঘরিয়ার বাসিন্দা বিগত পৌর নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী দেওয়ান গণিউল সালাদীন বলেন,‘পৌরসভার নাগরিকদের উপর অস্বাভাবিক করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ায় করণিয় নির্ধারণের জন্য শুক্রবার রাতে আমার নিজের মহল্লা তেঘরিয়ার বাসিন্দাদের সঙ্গে আমি মতবিনিময় করেছি। মতবিনিময় চলাকালেই পৌরসভার একটি প্রচার মাইক শুনেছি, বলা হয়েছে পৌর নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কর নির্ধারণ করা হবে। এই উদ্যোগকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। আশা করা যায়, শহরের সকল শ্রেণি পেশার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গণসংলাপের মাধ্যমে সহনীয় পর্যায়ে পৌর কর নির্ধারণ হবে। অসহনীয় পৌর কর নির্ধারণ হলে আমি মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবো’।
পৌর মেয়র আয়ুব বখ্ত জগলুল এ প্রতিবেদককে এবং শুক্রবার বিশেষ ঘোষণায় বলেন,‘পৌরসভার বাসা-বাড়ি, বাণিজ্যিক-আবাণিজ্যিক ভবনের পৌরকর নির্ধারণের বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি গেজেট মোতাবেক করা হয়েছে। গত দুই বছর আগেই পৌর কর বৃদ্ধির চিঠি এসেছিল। সুদীর্ঘ দিন পৌরসভার কর নির্ধারণ না করায় প্রাথমিক কর সম্মানিত করদাতাদের নিকট অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। এই জন্য আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ পৌরসভার ‘কর রিভিউ কমিটি’তে নাগরিকগণের আপত্তি জানানোর বিস্তর সুযোগ রয়েছে। কর রিভিউ কমিটি’তে সম্মানিত করদাতাগণের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সহনশীল পর্যায়ে কর নির্ধারণ চূড়ান্ত করা হবে। পৌরবাসীর উপর বোঝা হয় এমন কোন করারোপ পৌর কর্তৃপক্ষ করবে না’।


