পি সি দাস, শাল্লা
মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের গৃহ নির্মাণে অনিয়মের কারণে শাল্লা উপজেলার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মুক্তাদীর হোসেন কে শাস্তি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কেএম আলী আজম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। শাল্লার বর্তমান ইউএনও আবু তালেব জানালেন, দ্ইুদিন আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এরকম একটি প্রজ্ঞাপন হয়েছে শুনেছেন তিনি।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় একই বিধিমালার ৪(২) (খ) বিধি অনুযায়ী তার ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ২ (দুই) বৎসরের জন্য স্থগিত’ করা হয়েছে। তিনি ২ (দুই) বৎসরের বর্ধিত বেতন পাবেন না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আল-মুক্তাদির হোসেন গত ১২ নভেম্বর ২০১৮ হতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শাল্লা হিসেবে কর্মরত থাকাকালে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে শাল্লা উপজেলায় ১ম পর্যায়ের বরাদ্দকৃত ১ হাজার ৪৩৫টি ঘরের মধ্যে ১৮২ টি ঘরের জমি নির্বাচন সঠিকভাবে না করায় ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে জটিলতা তৈরী হয়েছে। যারমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিতে ১৮টি ঘর, সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে ৫ ঘর, পূর্বে বন্দোবস্তকৃত ভূমিতে ১৫৩ ঘর এবং পার্শ্ববর্তী দিরাই উপজেলার চর হবিপুর মৌজার ব্যক্তি মালিকাধীন ভূমিতে ৬টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়াও প্রকল্পে ঘর নির্মাণের সময় ১৪০ ঘর ডিজাইন বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ডিজাইন পরিবর্তন করে ঘর নির্মাণের পূর্বে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেন নি। ডিজাইন পরিবর্তন করে ১৪০ টি ঘর নির্মাণ করে প্রতিটি গৃহ নির্মাণে ১২ হাজার ১৩৮ টাকা করে কম খরচ করা হয়েছে। তদন্তকালে কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক, নির্বাহী প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সুনামগঞ্জ এর ২৭ জুন ২০২১ তারিখের ১৮০৫ নং স্মারকে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে এটি উল্লেখ করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ্য।
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক কর্তৃক কারণ দর্শানোর জবাবে কিছু উল্লেখও করেন নি ইউএনও মুক্তাদীর। ডিজাইন ব্যত্যয়ের কারণে সাশ্রয়কৃত টাকা (প্রতিটি ঘর ১২ হাজার ১৩৮ টাকা হিসাবে ১৪০ টি ঘরের জন্য ১৬ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩২০ টাকা) সরকারি খাতে ফেরত প্রদানও করেন নি।
এ কারণে মন্ত্রণালয়ের ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখের ০৫.০০.০০০০.২৭.০১৯.২১(বি.মা)-৩৩৪ সংখ্যক স্মারকে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) ও ৩(ঘ) অনুযায়ী যথাক্রমে ‘অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতা’ এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা রুজু করে কৈফিয়ত তলব করা হয়।
একই সাথে কেন তাকে চাকুরি হতে বরখাস্ত বা অন্য কোন উপযুক্ত দ- প্রদান করা হবে না তা অভিযোগনামা প্রাপ্তির ১০ (দশ) কার্য দিবসের মধ্যে জানানোর জন্য এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি ব্যক্তিগত শুনানি চান কিনা তা তার লিখিত জবাবে উল্লেখ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখ লিখিত জবাব দাখিলপূর্বক ব্যক্তিগত শুনানির জন্য আবেদন করেন। পরে ১৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখ ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণপূর্বক ন্যায় বিচার ও সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করে গত ১৪ আগস্ট ২০২২ তারিখ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ১৬ লক্ষ ৯৯ হাজার ৩২০ টাকা ফেরত প্রদান না করলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা কর্তৃক টাকা আত্মসাৎ করাও হয়নি। উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্ষার পানি হতে নির্মিত ঘরসমূহ রক্ষার জন্য প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতিপরায়ণতা’-এর অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় নি। তবে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। এজন্য তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী এবং একই বিধিমালার ৪(২)(খ) বিধি অনুযায়ী তার ‘বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ২ (দুই) বৎসরের জন্য স্থগিত’ রাখার লঘুদ- প্রদান করা হলো। তিনি ২ (দুই) বৎসরের বর্ধিত বেতন কখনও প্রাপ্য হবেন না। দুই বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তৃতীয় বৎসর হতে তিনি বর্ধিত বেতন প্রাপ্য হবেন মর্মে নির্দেশ প্রদান করা হলো।
প্রসঙ্গত, মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার গৃহহীনদের গৃহ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক ২০২১ সালের ৭ জুন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। এসময় দরিদ্র গৃহহীনদের দেওয়া পরিবহন খরচের ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকাও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
গত বছরের জানুয়ারি মাসেই এই উপজেলার ঘর প্রদানে স্থানীয়ভাবে অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। ঘরের মেঝেতে ইট না দিয়ে যেনোতেনো ভাবে বালু-সিমেন্টের মিশ্রনের মসলা দিয়ে ফ্লোর করে দেওয়া, নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর ব্যবহার, নির্মাণের মালামাল পরিবহনের টাকা গৃহহীনদের উপর চাপিয়ে দেওয়া, মিস্ত্রির টাকা গৃহহীনদের দিতে বাধ্য করাসহ নানাভাবে অসহায় মানুষজনের কাছ থেকে টাকা নেবার অভিযোগ ওঠে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে এই নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়।
পত্রিকায় সংবাদের প্রেক্ষিতে গত চার ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক মো.জাহাঙ্গীর হোসেন, ৩ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ২০ জন ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে নিয়ে শাল্লায় তদন্তে যান। ওখানে একাধিক দলে ভাগ হয়ে নির্মাণাধীন গৃহহীনদের ঘরে ঘরে সরেজমিন যান তাঁরা। ২০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণসহ ২৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট ওখানকার নির্মাণাধীন প্রত্যেক ঘরে ঘরে যান। এরপর আরও দুই দফায় জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ ২৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট ওখানে দিনব্যাপি গিয়ে তদন্ত করেন।
তদন্তকালীন সময়েই গৃহ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রহমানকে ১৮ ফেব্রুয়ারি স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
তদন্ত শেষে জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন যেসব ঘরে ইট সলিং না করে মেঝে পাকা করা হয়েছে, সেগুলোতে ইট সলিং করে মেঝে পাকা করার নির্দেশ দেন। পরিবহন খরচ এবং মিস্ত্রির খরচের টাকা দরিদ্র মানুষজন যারা নিজেরা দিয়েছে, ওই টাকা ফেরত দিতে নির্দেশ দেন।
- জামালগঞ্জে দুই হাজার মিটার নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ছাই জব্দ
- বৈদ্যুতিক খুঁটি রেখে মহাসড়কে ঢালাই, দুর্ঘটনার আশংকা


