বোরো রক্ষায় ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ নীতিমালা অনুসারে ১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এই ডেটলাইন অনুসারে ১৫ ডিসেম্বরের আগেই প্রাক্কলন তৈরিসহ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে কার্যাদেশ জারি হওয়ার কথা। এবার জেলায় প্রায় ৭০০ প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁধের কাজ বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এ পর্যন্ত জেলা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটি ২৪৭ টি পিআইসি অনুমোদন দিতে পেরেছে। অর্থাৎ ৬৫ ভাগ পিআইসিই অনুমোদন হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও হাওর থেকে পানি নামার বিলম্বকে পিআইসি গঠন না হওয়ার কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে। জেলার প্রধান ফসল বোরো ধান চাষাবাদের জন্য বাঁধের কাজ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এজন্য কোনো অজুহাত হিসাবে সামনে আসতে পারে না। মূলত পিআইসি’র মাধ্যমে বাঁধের কাজ বাস্তবায়নের বিষয়টি এখন জনঅংশগ্রহণমূলক কাজের পরিবর্তে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রভাবপুষ্ট একটি প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে। এর ফলে পিআইসি’র মাধ্যমে বাঁধের কাজও হয়ে উঠেছে সাবেক ঠিকাদারি প্রথার মতোই ব্যবসায়িক কর্মকা- বিশেষ। পিআইসি গঠনে বিলম্বের পিছনে এটি একটি বড় কারণ। মূলত ২০১৭ সনের অকাল বন্যার পর জেলায় ফসল মৌসুমে তেমন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। ফলে পিআইসি প্রথাকেও পড়তে হয়নি পরীক্ষার সামনে। পিআইসি’র মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণে যত ধরণের অভিযোগ উঠেছে তার সবগুলোই অনুকূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির কারণে বিনা চ্যালেঞ্জে পার পেয়ে গেছে। গত ৪ বছর বন্যা হয়নি বলে এবারও বন্যা হবে না এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বন্যা হবে ধরে নিয়েই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই ঝুঁকি সামলানোর জন্যই সরকার বাঁধের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। এখন যদি দেখা যায় এইসব বাঁধ প্রকৃত বিপদের সময় কোনো কাজেই না আসে তখন কি আবারও কৃষকদের রাস্তায় নামতে হবে?
পিআইসি গঠনে অনিয়ম-স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতির অভিযোগটি এখন প্রকাশ্য। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে বাঁধ নির্মাণের বিলম্ব নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে শাল্লা উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সাত্তার বলেছেন, ‘পিআইসিতে বাঁধের পাশের জমির মালিক কৃষকদের যুক্ত করার কথা থাকলেও জমি নেই, খাজনা দেয় না, এমন কৃষককেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যুক্ত করা হয়্’ একই উপজেলার সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অবনী মোহন দাস বলেছেন, ‘যেখানে ৭ লাখ টাকায় কাজ করা যায় সেখানে ৬০ লাখ টাকা গেল বছর বরাদ্দ হয়েছে এমন উদাহরণও আছে।’ এইসব কথা গত কয়েক বছরের পিআইসি-অভিজ্ঞতার ফলাফল। বস্তুত গণমুখী পিআইসি প্রথাকেও সুচতুর আমলা-রাজনৈতিক গোষ্ঠী দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে, এসব অভিযোগ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প প্রণয়ন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রদান, অস্থানীয় ও অকৃষককে পিআইসি’র কর্তা বানানো ইত্যাদি ব্যাপকভাবে প্রকাশিত অভিযোগ। এছাড়া বিল পরিশোধে বিলম্বের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের কাজ করা থেকে নিরুৎসাহিত করার প্রক্রিয়াও আরেকটি চর্চা। বহু পিআইসি’র প্রকৃত কৃষকরা ধার-দেনা করে বাঁধের কাজ করে সময়মত বিল না পেয়ে লোকসানের সম্মুখীন হন। মূলত পিআইসি গঠনে রাজনৈতিকভাবে অনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বাঁধ এলাকার কৃষকদের মতামত গ্রহণ না করার চর্চা শুরু হয়েছে। এই প্রবণতাকে রুখতে না প্রালে ঠিকাদারি প্রথা আর পিআইসি প্রথার মধ্যে কোনো ফারাক থাকবে না।
জেলার ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আমরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পিআইসি গঠনে স্বচ্ছতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা বজায় রাখাও সমান জরুরি। মনে রাখতে হবে অনাহুত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যদি এইসব বাঁধ তেমন কার্যকরি হয় না তাহলে যে জনরোষ তৈরি হবে তার দায়িত্ব নিতে হবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। তারা কেন নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হতে দিবেন?

