বাঁধে অক্ষত মাটি, তবু বাড়ছে প্রকল্প

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
শতাব্দীর ভয়ংকর বন্যায় হাওরাঞ্চলের গুটিকয়েক বাড়িঘর ছাড়া সমগ্র লোকালয় ছিল পানিতে নিমজ্জিত। এ বন্যা ক্ষতির দিক থেকে অতীতের সকল রেকর্ড পেছনে ফেলেছে। কিন্তু গত বন্যায় ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হলেও সে তুলানায় ক্ষতি হয়নি ফসল রক্ষা বাঁধের। মাঝে মধ্যে বাঁধ ভেঙ্গে যে কয়টি বাড়তি ক্লোজারের সৃষ্টি হয়েছে তাও বেশিরভাগই মনুষ্যসৃষ্ট।
রেকর্ড বন্যার পরও হাওরের অধিকাংশ বাঁধে পুরোনো মাটির ছাপ চোখে পড়েছে। গত বন্যায় বাঁধে ক্ষতির পরিমাণ বিগত বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও সবকিছু মিলে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। জামালগঞ্জের হাওরে অনবিজ্ঞ সার্ভেয়ার দিয়ে যেনতেন প্রাক্কলনের মাধ্যমে হাওররক্ষা বাঁধের প্রকল্প ও ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে মনে করছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা। এছাড়া হাওর ঘুরে এখন পর্যন্ত বাঁধে কাজ শুরুর কোন আলামতই চোখে পড়েনি। এতে সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার অস্বস্তি আছে কৃষকের মাঝে।
গত মঙ্গলবার উপজেলার বৃহৎ হালি ও শনি এবং মহালিয়া হাওরের বেশকিছু জায়গা ঘুরে দেখা যায়, বাঁধ এলাকার স্থানে স্থানে ছোট-বড় যে কয়টি ক্লোজারের সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলো প্রায় পুরোনো আদলেই রয়ে গেছে। শুধু স্থানভেদে কিছুটা এদিক-সেদিক হয়েছে। এর মধ্যে গত ফসল তোলা মৌসুমে ভেঙ্গে যাওয়া হালি হাওরের আছানপুরের ভাঙ্গাটি সবচেয়ে বড়। যেটি গত বছর মদনাকান্দি গ্রামের বিপরীতে মহালিয়া হাওরপাড়ে মেরামতকৃত ৫ ও ৬ নম্বর পিআইসিভুক্ত ক্লোজারের প্রায় সমান। একই হাওরের হিজলা গ্রামের পূর্বদিকে আরেকটি নতুন ক্লোজারের সৃষ্টি হয়েছে। সেটি অন্যান্য বছর এর আশেপাশে মেরামত করা ভাঙ্গার মতোই মনে হয়েছে।
অন্যদিকে, বিগত বছরগুলোতে মামুদপুরের ভাঙ্গা নিয়ে যে শঙ্কা ছিল এবছর তেমনটা নেই। কারণ সেখানে হাওরের পানি নিষ্কাশনে একটি সরু খাল খনন করা হয়েছে। যে খালে খননের অবশিষ্ট মাটি ফেলে মেরামত করা যাবে, এমনটাই প্রতীয়মান হয়েছে। এছাড়া হাওড়িয়া আলীপুর ও বদরপুরের মাঝখানে ঘনিয়ার বিলসংলগ্ন যে ক্লোজারটি আছে সেখানে প্রায় প্রতি বছরই ছোট-বড় ক্লোজারের সৃষ্টি হয়। এর সাথে হালি হাওরের বিপজ্জনক আরেকটি ভাঙ্গা হচ্ছে কালীবাড়ি ক্লোজার। সেটিতেও কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর আলাদা নজর দিয়ে থাকেন।
অপরদিকে, শনির হাওরের জামালগঞ্জ অংশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ লালুরগোয়ালা ক্লোজারটি প্রতি বছরই বিশেষ বিবেচনায় থাকে। পাশাপাশি এ হাওরের ঘনিয়ার বিলসংলগ্ন বাঁধের বিপরীত তীরেও দু’এক জায়গায় ক্লোজারের দেখা মিলেছে। যেখানকার ভাঙ্গা ভরাটকরণে সব সময়ই প্রকল্প বরাদ্দ দিয়ে আসছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া হাওরের অধিকাংশ বাঁধজুড়ে পুরোনো মাটি রয়ে গেছে। ক্লোজার ব্যতীত কোন কোন বাঁধে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মাটির ক্ষয় হলেও অনেক বাঁধে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ভাগ মাটির অস্তিত্ব চোখে পড়েছে। বাঁধ দেখে বন্যায় যতটুকু ক্ষতি হওয়ার কথা ততটুকু ক্ষতি হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। তারপরও প্রকল্প বরাদ্দ কেন বেড়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, পাগনা হাওরের সবচেয়ে বড় ক্লোজার বোগলাখালি। যা গত বছর ৩৪ ও ৩৫ নম্বর পিআইসি অনুকূলে ছিল। এ বছর একই ক্লোজার গত বছরের স্থান পরিবর্তন করে একটু সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। যাতে পুরাতন বাঁধের চেয়ে প্রায় অর্ধেক মাটি কম লাগার কথা বলছেন হাওর সচেতন মানুষেরা। এছাড়া পাগনা হাওরের উত্তরপূর্ব কোণে সুরমা নদীর তীরবর্তী উজ্জ্বলপুর নামক জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জ সড়ক সংযুক্ত বেড়িবাঁধ ভাঙ্গায় এলজিইডি সড়ক ভেঙ্গে মারাত্বক ক্ষতিসাধন হয়েছে। সেটা নিয়ে পাগনা পাড়ের কৃষকরা মারাত¦ক দুশ্চিন্তায় আছেন।
পিআইসির তালিকা অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে উপজেলার ছোট-বড় ছয়টি হাওরের ৪৪ টি পিআইসিতে বরাদ্দ ছিল পাঁচ কোটি ৯১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। পরের বছর অর্থাৎ ২০২১-২২ মৌসুমে উপর্যুপরী বন্যার পরও আগের বছর থেকে ৮ টি পিআইসি কমে ৩৬টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৫ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬১ টি পিআইসি হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যাতে ২৫ টি প্রকল্প বাড়তে পারে। যার সম্ভাব্য ব্যয় ৯ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মৌসুমে শনি হাওরের জামালগঞ্জ অংশে ৪ টি প্রকল্পের বিপরীতে এ বছর ৮টি, হালি হাওরে ১৩ টি প্রকল্পের বিপরীতে চলতি বছর ২২টি, পাগনা হাওরে ১২ টির স্থলে ১৮ টি এবং মহালিয়া হাওরে ৪ টি পিআইসির বিপরীতে ৬ টি পিআইসি হতে পারে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাওর পাড়ের কৃষক ও হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বন্যায় বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটের যতটুকু ক্ষতি হয়েছে হাওরের বাঁধে তেমনটা হয় নি। কারণ বন্যা যখন হয়েছে, তখন হাওরের বাঁধ এমনিতেই পানির নীচে ছিল। তাই ক্ষতিটা যে রকম ভাবা হচ্ছে সে রকম হয় নি। তারপরও হাওরের বিভিন্ন জায়গায় কিছু ক্লোজারের সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো প্রতি বছরই কম-বেশি হয়ে থাকে। তাতে বড়জোর ৭-৮ টি পিআইসি বাড়তে পারে। কিন্তু যেভাবে ২০ থেকে ২৫ টি পিআইসি বাড়ানো হচ্ছে তাতে মেজারমেন্টে পর্যাপ্ত দুর্বলতা আছে। এতে কৃষকের নাম করে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়ের পথ খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কেউ কেউ।
পিআইসি বাড়ার ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করে হালি হাওরপাড়ের (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এক কৃষক বলেন, ‘এতগুলা পিআইসি বাড়ানোর কোন যুক্তি আছে! যেখানে মাটি লাগে না এইখানেও মাটি দেওয়া হয়। বন্যায় যে ক্ষতিডা দেখানো হইতাছে এই পরিমাণ ক্ষতি হইছে না। পিআইসি অনেক বাড়তি মনে হইতাছে।’


উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম কলমদর বলেন, কর্তৃপক্ষ বলছে কৃষকের স্বার্থে প্রকল্প বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্প বেড়েছে ভালো কথা, তবে কাজ ভালো হওয়া চাই। খোঁজ নিয়ে যতটুকু জেনেছি হাওরের অনেক বাঁধই অক্ষত আছে, বাঁধে পুরোনো মাটিও রয়ে গেছে। এতে বাঁধের মেজারমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন আছে। সঠিক মেজারমেন্ট অনুযায়ী যদি প্রকল্প বেড়ে থাকে তাহলে কিভাবে বেড়েছে সেটা উপস্থাপন করলে ভালো হয়।
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ হাওর থেকে ফিরে জানিয়েছেন, পাগনা হাওরের বিপজ্জনক ক্লোজার বোগলাখালির স্থানান্তরকৃত স্থানে নতুন নির্ধারিত বাঁধে মাটি, সময় ও অর্থ ব্যয় কম হওয়ার কথা। তারপরও শুনেছি এখানে পিআইসি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু পাগনা হাওরের উজ্জ্বলপুর অংশে এলজিইডি সড়কসহ পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কয়েকটি বড় ক্লোজারের সৃষ্টি হওয়ায় সুরমা নদীর পানি ফুলেফেঁপে উঠলে বিপদ হতে পারে। সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, প্রায় অধিকাংশ প্রকল্পই অপরিকল্পিতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। অযথাই পিআইসি বাড়ানো হচ্ছে। অনেক বাঁধেই মাটি আছে, যেখানে একটু রিপিয়ারিং করলেই চলে সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণ। এগুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং সরকারি অর্থ নয়ছয়ের পাঁয়তারা বলেই আমরা মনে করি।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, পাউবোর সার্ভের মাধ্যমে স্কিম তৈরি হয়। সার্ভের ভিত্তিতে পিআইসি গঠন করা হয়েছে। আর সার্ভে যাচাই করার জন্য টাস্কফোর্স কাজ করবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পিআইসি গঠনের ব্যাপার কোন অভিযোগ পাওয়া যায় নি। মাটি যেখানে অক্ষত আছে অর্থাৎ আরএল ৬.৫ মিটারের উপরে আছে সেখানে নো ওয়ার্ক আছে।
পাগনা হাওরের বোগলাখালী বাঁধের জন্য পিআইসি আরও দুইটা বাড়বে এবং সর্বমোট চারটি পিআইসি বেড়ে ৬১ টি হতে পারে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, বিগত বন্যায় বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। তাই কিছু জায়গার ডিজাইনে ১:৩ স্লোপ দেয়া ও তেলের দাম বৃদ্ধিসহ কাজের রেট বাড়ায় প্রকল্প খরচ বাড়ছে। উজ্জ্বলপুরসহ কয়েকটি ক্লোজারের কাজ শুরু হয়েছে। নরম মাটিতে এক্সকেভেটর চলার উপযোগী না হওয়ায় কাজে দেরি হচ্ছে। তবে সকল পিআইসিকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।