বাঁধে বাঁধে কৃষকদের লড়াই

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরে হাওরে চলছে কৃষকের ফসল রক্ষার যুদ্ধ। জেলার বড় হাওরগুলোর ফসল রক্ষায় বাঁধে বাঁধে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন হাজারো কৃষক। বেশিরভাগ কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘অসময়ে হওয়া বাঁধের মাটি কমপেকসন না হওয়ায় (না বসায়) বৃষ্টি পড়তেই ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও কোথাও বাঁধের নীচ দিয়ে হাওরে পানি ঢুকছে, পিআইসিসহ বাঁধ নির্মাণকারীদের অবহেলায় এখন আমরার ঘুম নাই।’ মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে বাঁধে বাঁধে গেছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. মোশাররফ হোসেন। তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে বাঁধে থেকে কৃষকদের সাহস দেবার অনুরোধ জানিয়েছেন।
গত চার দিন ধরে সুনামগঞ্জের উজানে (ভারতের মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে)। মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সোমবার দিনে ও রাতে চেরাপুঞ্জিতে ৪৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র সাত মিলিমিটার।
উজানের এই বৃষ্টির পানিতে সুনামগঞ্জের সকল নদী টইটুম্বুর হয়ে গেছে। হাওরের বাঁধের বিপদসীমার প্রায় সমানে সমানে যাচ্ছে নদীর পানি। মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের নদীগুলোর পানির উচ্চতা ছিল ৫.৯৯ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপদ সীমার মাত্র ৬ সেন্টিমিটার (বাঁধের বিপদ সীমা ৬.০৫ সেন্টিমিটার) নীচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ২০১৭ সালের পর ৫ এপ্রিল এমন উচ্চতায় গেল চার বছর ছিল না নদীর পানি। নদীর পানি বাঁধের বিপদ সীমার সমানে হওয়ায় অনেক স্থানেই অসময়ে হওয়া বাঁধ চুঁইয়ে নীচের দিকে পানি ঢুকছে বা বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে। তবে বড় কোন হাওরে বাঁধ উপচে পানি ঢুকার খবর পাওয়া যায় নি এখনো।
সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত জেলার জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের দুটি, জামালগঞ্জের হালির হাওরের গণিয়ার খাড়া, শনির হাওরের নান্টুখালি ও বোগলাখালি, ধর্মপাশার চন্দ্রসোনারতাল, সোনামোড়ল, দিরাইয়ের বরাম হাওরের তুফানখালি, কটাইখালি, বোয়ালিয়া এবং বিশ^ম্ভরপুরের হরিমনের ভাঙার বাঁধে কৃষকরা কাজ করছিলেন। এসব বাঁধের কোথাও ফাটল, কোথাওবা নীচ দিয়ে পানি ঢুকছে।
জগন্নাথপুরের মজিদপুরের কৃষক লায়েক আহমদ বললেন, বাঁধে কাজ যখন হবার কথা, তখন হয় নি, অসময়ে হওয়া বাঁধের মাটি বসতে বসতে পানি এসেছে, নরম মাটির নীচ দিয়ে পানি ঢুকে বাঁধ হুমকিতে পড়েছে, বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে।
বিশ^ম্ভরপুরের করচার হাওরপাড়ের রাধানগর, বিশ^ম্ভরপুর ও নলুয়ারের পাড়ের কৃষক জমির হোসেন, লিয়াকত মিয়া, রমজান আলী, মোস্তাক মিয়া, সাবাজ মিয়া, হারুনুর রশি ও চাঁন মিয়াসহ কয়েকশ কৃষক ভোর থেকেই হাওরের হরিমনের ভাঙার বাঁধের নীচ দিয়ে পানি ঢুকা ঠেকাতে কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এই কৃষকরা বললেন, ‘সরকার কৃষকের ধান বাঁচাতে টেকা দেয়, ই—টেকা ভাগবাটোয়ারা হবার পর কাজ যা হয়, তাও হয় অসময়ে, যেভাবে হওয়া প্রয়োজন সেভাবে হয় না, এই কারণে আমরা বিপদে পড়ি।
করচার হাওরের ১নং পিআইসির হরিমনের ভাঙ্গা ও বেকা বাঁধে কয়েকটি ছোট ছোট ফাটল ও ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকেছে। বাঁধ রক্ষার জন্য সোমবার থেকে রাধানগর, কৃষ্ণনগর, বিশ্বম্ভরপুর, ফুলভরী, ঘাঘটিয়া, মুক্তিখলা, মল্লিকপুর, পদ্মনগর, নলোয়ারপাড়, রায়পুর সহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা কাজ করছেন।
সোমবার রাতে জগন্নাথপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় নলুয়ার হাওরের কলকলিয়া ইউনিয়নের গোড়ারগাঁও ও বেটুখাল এলাকায় বাঁধে ফাটল ধরেছে। পরে মসজিদের মাইকে বেড়িবাঁধ রক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়। রাতেই গোড়ারগাঁও, হিজলা, নাদামপুর ও মজিদপুরের শত শত কৃষক স্বেচ্ছাশ্রমে কাজে নামেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ—পরিচালক বিমল কুমার সোম জানালেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ছোট ছোট ৬ হাওর ডুবেছে। জেলায় এবার দুই লাখ ২২ হাজার ৮০৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করে ১৩ লাখ ৫২ হাজার ২২০ মে.টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মোশাররফ হোসেন মঙ্গলবার সকাল থেকে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর হোসেনকে নিয়ে বিপদজনক বাঁধে বাঁধে ঘুরেছেন। তিনি বললেন, এই পর্যন্ত ৫০০ হেক্টরের মতো জমি পানিতে ডুবেছে। পানি নামলে ক্ষতির পরিমাণ কমবে। পানি বাড়লে বিপদে পড়তে হবে।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, সুনামগঞ্জের উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জি—মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জের নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৭ মিলিমিটার, কিন্তু ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি হয়েছে ৪৩৪ মিলিমিটার। এই বৃষ্টির পানি নীচের দিকে নামছে। সুনামগঞ্জে মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্ট দিয়ে ৫.৯৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি যাচ্ছিল। সুরমা নদীর এই পয়েন্টে হাওরের বাঁধের বিপদ সীমা ৬.০৫ সেন্টিমিটার।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জের কৃষকদের জন্য আশার খবর জানিয়ে বলেছেন, সুনামগঞ্জের উজানে (মেঘালয়— চেরাপুঞ্জিতে) ১১ মার্চ পর্যন্ত বৃষ্টি একেবারেই কম আছে। তবে বুধবার রাতে এবং নয় ও দশ মার্চ ভোরে সুনামগঞ্জে কিছু বৃষ্টি হতে পারে। উজানের বরাক উপত্যকায় এই সময়ে সামান্য বৃষ্টি রয়েছে।