একের পর এক হাওর ডুবির প্রেক্ষিতে এখন বাঁধ নির্মাণের দুর্নীতির বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে চলে এসেছে। হাওরের কৃষক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের কথা একটাই, ভয়াল বিস্তৃত দুর্নীতি সংঘটিত না হলে পানির প্রাথমিক ধাক্কায় এভাবে তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ত না বহু টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধগুলো। বলছি বটে বহু টাকায় নির্মিত। কিন্তু আসলে টাকা বাঁধে ব্যয়িত হয়েছে যৎসামান্যই। সবই গেছে নানা জনের পকেটে। ৬ এপ্রিলের দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হাওরপাড়ের কৃষকদের সংক্ষুব্ধ মন্তব্য ছিল এরকমÑ ‘‘সরকার কৃষকের ধান বাঁচাতে টেকা দেয়, ই—টেকা ভাগবাটোয়ারা হবার পর কাজ যা হয়, তাও হয় অসময়ে, যেভাবে হওয়া প্রয়োজন সেভাবে হয় না, এই কারণে আমরা বিপদে পড়ি।’’ এই ক্ষুব্ধ উচ্চারণই যাবতীয় কথার সারমর্ম। সকলেই জানেন এ কথা। কিন্তু প্রতিকারহীনভাবে এই—ই ঘটে চলেছে, বছর নিরবধি। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে ধর্মপাশার এক পিআইসি’র তৃতীয় কিস্তির টাকা ব্যাংক থেকেই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ঘনিষ্টজন হিসাবে পরিচিত জনৈক ব্যক্তি নিয়ে গেছেন। নিজের টাকা হাতে না পেয়ে ওই পিআইসি সভাপতি উজ্জ্বল মিয়া বাঁধে নিয়োজিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারবেন না বলে এলাকায় যাচ্ছেন না। রীতিমত মাফিয়া কায়দায় তার থেকে এ টাকা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তৃতীয় কিস্তির চেক পান ওই সভাপতি। ভাঙাতে যান সোনালী ব্যাংকে। ব্যাংক চেক নগদায়নে অস্বীকৃতি জানায়। পরে উপজেলা চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ট মোখলেছ মিয়া চেকটি নিয়ে নেন এবং ব্যাংক কাউন্টার থেকে চেকের টাকা তোলেন। মোখলেছ আর ওই টাকা উজ্জল মিয়াকে দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। ব্যাংক বলছে, উপজেলা চেয়ার্যান নিষেধ করায় তারা প্রথমে চেক ভাঙাতে অপারগতা জানায় পরে উপজেলা চেয়ারম্যানই অনুরোধ করলে টাকা দেয়া হয়। কী তুঘলকি কাণ্ড ভেবে দেখুন। একজনের বৈধ চেক ক্যাশ করতে ব্যাংক অপারগতা জানায়। পরে ওই চেকই ক্যাশ করা হয় কিন্তু টাকা উঠে আরেকজনের হাতে। ব্যাংককে এই ক্ষমতা কে দিল? ব্যাংকের এই অপকর্মের জবাব কে দিবে? উপজেলা চেয়ারম্যান কোন্ এক্তিয়ারে ব্যাংককে একটি বৈধ চেক ভাঙাতে নিষেধ জারি করেন? ওই জনপ্রতিনিধির এই অন্যায় কি জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে?
গতকাল হাওর বাঁচাও আন্দোলন শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। ওখানে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বলেছেনÑ ‘‘এই বছরের হাওর রক্ষা বাঁধের লুটপাট ২০১৭ সালকেও হার মানিয়েছে।’’ ২০১৭ সনের ব্যাপক বাঁধ দুর্নীতির কারণে হাওরাঞ্চলে যে গনজাগরণ তৈরি হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে দুনীতিগ্রস্ত ঠিকাদারি প্রথা সরকার বাতিল করে পিআইসি পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এবার তাহলে পিআইসি পদ্ধতিও আগের ঠিকাদারি প্রথার দুর্নীতিকে অতিক্রম করে ফেলল? কী সৃজনশীল জাতি আমরা। যেকোন পদ্ধতিকেই দুর্নীতিপ্রবণ করে ফেলতে ওস্তাদ । এখন কী হবে? পিআইসি বাদ দিয়ে আবারও ঠিকাদারি? নাকি অন্য কোন পদ্ধতি? তবে যে পদ্ধতিই আসুক রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক অভ্যাস পরিবর্তন না হলে কোন পদ্ধতিই কাজে আসবে না। ক্ষমতা চর্চার জায়গায় অভ্যাসের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে যেকোন পদ্ধতিতেই সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব। আসলে ব্যবস্থার পাশাপাশি ব্যবস্থার সাথে জড়িত রক্তমাংসের মানুষগুলোর স্বভাবচরিত্রটা হল গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য কী করা দরকার তাই ভাবতে হবে।
দেশে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছে। জনগণের প্রতি এই সরকারের প্রতিশ্রম্নতি রয়েছে। হাওরে এই যে লুটপাটের রাজত্ব কয়েম হয়েছে তার দায় শেষ পর্যন্ত ওই রাজনৈতিক সরকারের ঘাড়েই পড়বে। এখন দেখার বিষয় হলÑ সরকার কি এই দায় বিনা কথায় মেনে নিবে নাকি দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের জন্য তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
- দিরাইয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে লাঞ্ছিত পিআইসি’র সদস্য সচিব
- ছাতকে বালু চাপায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু আহত ১

