বাঁধ না হওয়ায় সুনামগঞ্জের হাওরে ফসলডুবি- ২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার জামানত বাজেয়াপ্ত

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের ৩৬ টি হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে গাফিলতি, চুক্তি মোতাবেক কাজ না করায় কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এই মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে সুনামগঞ্জ পাউবো’র ৪৭ জন ঠিকাদারকে। এরা সকলেই দুদকের মামলার আসামী। নোটিশপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের মধ্যে ৩০ জন জবাব দিয়েছেন। এই জবাব নিয়ে বুধবার পাউবো’র সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ঢাকায় গিয়েছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার পাউবো’র প্রধান প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এসব জবাব যাচাই-বাছাই এবং পর্যালোচনা করবেন। পরে এই বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ২০ টি প্যাকেজের ৭ জন ঠিকাদারের কার্য জামানতের দুই কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৭০৬ টাকা ৭৯ পয়সা বাজেয়াপ্ত করেছে পাউবো।
পাউবোর একজন কর্মকর্তা জানান, জেলার ১১ উপজেলার ৩৬ টি হাওরের ১৬০ টি প্যাকেজের ৪৭ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে গত ৩১ আগস্ট এই কারণ দর্শানোর নোটিশ (স্মারক নম্বর-আর-১৩/২৭০) পাঠানো হয়। বুধবার পর্যন্ত ৩০ জন ঠিকাদার এই চিঠির জবাব দিয়েছেন।
প্রত্যেকের নোটিশেই বলা হয়েছে, বর্ণিত প্যাকেজের বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে আপনার অনুকূলে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ৩১ মার্চ ২০১৭ তারিখে কাজ সমাপ্তির জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আপনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বর্ণিত প্যাকেজের কাজ সময়মতো বাস্তবায়ন না করার কারণে আগাম বন্যায় সংশ্লিষ্ট হাওরের বোরো ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় সময়মত যথাযথভাবে কাজ না করায় আপনি চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়, ‘এই অবস্থায় নোটিশ জারির ২৮ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে অত্র দপ্তরকে এই বিষয়ে অবহিত করতে হবে। অন্যথায় আর কোন নোটিশ ছাড়াই চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে আপনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তি আরোপ করা হবে।’
এদিকে, একই সময়ে পাউবোর আরেক পত্রে ২০ টি  প্যাকেজের ৭ জন ঠিকাদারের কার্য জামানতের দুই কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার   ৭০৬ টাকা ৭৯ পয়সা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাদের কাজের অগ্রগতি জিরো থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে দেখানো রয়েছে। এরা হলেন- ঠিকাদার মেসার্স খন্দকার শাহীন আহমেদ, তাঁর ৭ টি প্যাকেজে এক কোটি ৩৫ লাখ ৮৯ হাজার ৭৪৫ টাকা ২৮ পয়সা, সজিব রঞ্জন দাসের ৫ টি প্যাকেজের ৫৬ লাখ ৭৩ হাজার ৭৩৯ টাকা ৮৩ পয়সা, মেসার্স নূর ট্রেডিংয়ের ২২ লাখ ৭১ হাজার ৭২৭ টাকা ৬৯ পয়সা, মেসার্স সুয়েব এন্টারপ্রাইজের দুটি প্যাকেজের ৯ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯২ টাকা ছয় পয়সা, মেসার্স এলএন কন্সট্রাকশনের ১ টি প্যাকেজের ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪৮ টাকা ৫৩ পয়সা. টেকবি ইন্টারন্যাশনালের ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৬ টাকা ২৮ পয়সা, মো. আতিকুর রহমানের ৩ লাখ ১৬ হাজার ২৫৪ টাকা ১৫ পয়সা এবং মাহিন কন্সট্রাকসনের ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৫২ টাকা ৯৭ পয়সা বাজেয়াপ্ত করার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জামানতের এই টাকা বাজেয়াপ্ত করার জন্য সাউথ ইস্ট ব্যাংকের সিলেট নগরের মদিনা মার্কেট শাখা এবং একই ব্যাংকের হেতিমগঞ্জ শাখাকে চিঠি পাঠানো হয়।
সুনামগঞ্জ পাউবো’র বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন,‘২০১৫-১৬ এবং ২০১৭ সালে ৪৭ জন ঠিকাদার ১৬০ প্যাকেজে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ পেয়েছিলেন। এদের মধ্যে ০ থেকে ৯০ শতাংশ যারা কাজ করিয়েছেন, তাঁদের সকলকেই নোটিশ করা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত যে কয়েকজনের ৯০ শতাংশ কাজের রিপোর্ট আমরা পেয়েছি, তারা কেন ১০ শতাংশ কাজ করলেন না, সেটিরও জবাব চাওয়া হয়েছে। যারা এর চেয়েও কম কাজ করিয়েছেন তাঁদেরকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না জানতে চাওয়া হয়েছে। যারা কাজ করেননি, তাঁদের কার্য জামানত বাজেয়াপ্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কার্য জামানতের টাকা পাউবো’র আঞ্চলিক হিসাব কেন্দ্র রেকে জমা দেবার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো দুদক’এর মামলার আসামীর তালিকায় রয়েছেন। অবশ্য ৩০ টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বুধবার সকাল পর্যন্ত জবাব দিয়েছেন। এগুলো নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছি আমরা। বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ দায়িত্বশীলরা এসব জবাব পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই করবেন। এরপর আমরা চূড়ান্ত কার্যক্রম গ্রহণ করবো।’