হাওরাঞ্চলের ফসলরক্ষা বাঁধ পরিদর্শনে এসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সালমা জাফরিন গত বুধবার শাল্লায় বলেছেন, ‘‘বাঁধ নিয়ে শুধু নেগেটিভ নিউজ হয়, পজেটিভ নিউজ কম। যেভাবে উজানের পানি এসেছিল, বাঁধ নির্মাণ না হলে একটি হাওরেও আজ ফসলের দেখা মিলত না। পানিতে তলিয়ে যেত হাওরগুলো। এতেই প্রমাণিত হয়, হাওররক্ষা বাঁধের গুরুত্ব অপরিসীম।’’
অতিরিক্ত সচিব মহোদয়ের কথা থেকে দু’টি বিষয় বুঝা যায়। একটি হলোÑ হাওরে ফসলরক্ষা বাঁধের গুরুত্ব আছে। গুরুত্ব তো অবশ্যই আছে। গুরুত্ব না থাকলে সরকার বছর বছর হাওরে বাঁধ নির্মাণের নামে শত কোটি টাকা খরচ করতে যাবেন কেন। গুরুত্ব আছে বলেই হাওর অঞ্চলের মানুষ এই বাঁধ নিয়ে ভীষণভাবে স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল থাকেন। মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতেই এই বাঁধগুলো নির্মাণ করা হয়। আর জানা কথা, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের মেঘালয় বা আসামে বেশি বৃষ্টি হলে সেই পানি গড়িয়ে নীচে নেমে এসে আমাদের হাওরকে প্লাবিত করে দেয়। সমতলের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত থেকেও হাওরে পানি ঢুকার শঙ্কা থাকে। এই আকষ্মিক পানির ঢল যাতে আমাদের প্রধান কৃষিপণ্য বোরো ধান নষ্ট না করতে পারে সেজন্যই বাঁধ নির্মাণ। হাওরের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজে বাস্তবায়নকারীদের এক ধরনের গা ছাড়া ভাব দেখা যায়। সময়ের কাজ কখনও সময়ে শুরু করা হয় না। দেখা যায় নির্ধারিত সময়ের এক মাস পরেও কোথাও কোথাও বাঁধে মাটি ফেলার কাজ শুরু হয়নি। আবার যেসময় বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা সেসময় কাজ শেষ হয় না। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা। ওই তারিখের মধ্যে জেলার একটি বাঁধের কাজও শেষ হয়নি। মার্চ মাসেও পুরো বাঁধের কাজ শেষ হয়নি। এই দেরিতে শুরু ও সময়মত শেষ করতে না পারার কারণে শেষ মুহূর্তে কাজ বাস্তবায়নে পিআইসি’র তাড়াহুড়ো থাকে। এতে কাজের মান রক্ষিত হয় না। বাঁধে নতুনভাবে ফেলা মাটি যথাযথভাবে কমপেকশন হয় না। ঘাস লাগানো হয় না। উপরন্তু পিআইসি—দুর্নীতিকাণ্ড আরেক সর্বনাশা প্রপঞ্চ। এতে করে পানির একেবারে প্রাথমিক ধাক্কাটিই সামাল দিতে ব্যর্থ হয় এইসব বাঁধ। তাই প্রকৃতি একটু বিরূপ হলেই হাওরের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। এরই প্রতিফলন ঘটে সংবাদপত্রের পাতায়। অতিরিক্ত সচিব সংবাদপত্রে প্রকাশিত কৃষকদের উদ্বেগ—উৎকণ্ঠার বিষয়গুলোকেই সম্ভবত নেগেটিভ নিউজ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু জেলাবাসী মনে করেন এই নিউজগুলো মোটেই নেগেটিভ নয় বরং এরকম সংবাদ প্রকাশ করাই গণমাধ্যমের দায়িত্ব। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদগুলোতে কোন অসত্য তথ্য থাকলে তা নেগেটিভ চরিত্র ধারণ করত। কিন্তু বাঁধ সংক্রান্ত সংবাদগুলোতে তো কখনও কোন অসত্য তথ্য পরিবেশন করা হয় না। আজ যে হাওরের বাঁধগুলো সুরক্ষিত করতে মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের এতো তৎপরতা তার পিছনেও তো ওই সংবাদপত্রেরই ভূমিকা। তথ্যগুলো তো সংবাদমাধ্যই সরবরাহ করছে যা স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সহায়তা করে থাকে। সুতরাং সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যভিত্তিক সংবাদগুলোকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ না করে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হলে মূলত হাওর ও কৃষকদের স্বার্থই সংরক্ষিত থাকে।
বাঁধ রক্ষায় প্রশাসনের দিবারাত্র তদারকির বিষয়টি সংবাদপত্রে অতিশয় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়। প্রশাসন জনগণের পক্ষেই নিজেদের ভূমিকা পালন করেন। দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যও তাই করে। সুতরাং এই জায়গায় বিরোধের কোন অবকাশ নেই। বরং সংবাদমাধ্যম প্রশাসনের গণমুখী বৈশিষ্ট্যকে আরও সমুজ্জ্বল করার জন্যই দায়িত্ব পালন করে থাকে বলে আমাদের বিশ্বাস।

