স্টাফ রিপোর্টার
হাওরে বোরো ধানের ঝুঁকি কমাতে স্বল্প জীবনকালীন আগাম জাতের ধান চাষ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সময়মতো সংস্কারে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি এবং ধান পাকার পর তা দ্রুত কাটার জন্য হাওরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ধান কাটার মেশিন কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার প্রদানে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক।
মন্ত্রী বলেন, হাওরে ১২—১৪ লাখ টন ধান হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ধান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কোন কোন বছর আগাম বন্যার কারণে নষ্ট হয়ে যায়। এ ঝুঁকি কমাতে ১৫—২০ দিন আগে পাকে এমন জাতের ধান চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীরা অনেকগুলো জাত উদ্ভাবন করেছেন। এসব জাত চাষে কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, পিআইসির বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি অনিয়মের কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলব। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ যাতে প্রতি বছর ডিসেম্বরের আগে শুরু করা যায় সেটা নিয়েও আমি কথা বলবো।
শনিবার বেলা ১১টায় দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ও বোরো ধানখেত পরিদর্শনকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এসময় তিনি ব্লাস্ট রোগ হওয়ায় ব্রি ২৮ ও দেরিতে পাকার কারণে ব্রি ২৯ ধান হাওরে চাষ না করার জন্য কৃষকদেরকে আহ্বান জানান । তিনি বলেন, হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল বোরো ধান হয়। এ ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে, সেজন্য উচ্চফলনশীল জাতের ধান যেমন ব্রিধান ৮৯, ব্রিধান ৯২ এবং বিনাধান—১৭ চাষ করতে হবে। আমরা আপনাদেরকে এসব উন্নত জাতের ধানের বীজ দেব। আপনার এগুলো চাষে এগিয়ে আসবেন।
বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন প্রণোদনা ও খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী বোরোতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার দেয়া হবে। এছাড়া, সারা বছর ধরে ভিজিএফসহ বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে, যাতে খাদ্যের জন্য কেউ কষ্ট না করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে আছেন। ফসল রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও সময়মতো সংস্কারের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সকলে মিলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, বাঁধগুলো অনেকক্ষেত্রে সময়মতো সংস্কার হয় না। এক্ষেত্রে বাঁধ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বিদ্যমান নীতিমালার প্রয়োজনে পুনমূর্ল্যায়ন করা হবে। এছাড়া, পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নদী খননে উদ্যোগ নেয়া হবে।
শ্রমিক সংকটের কথা চিন্তা করে ও দ্রুততার সঙ্গে ধান কাটার জন্য হাওরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ড. রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান কৃষকবান্ধব সরকার ৭০% ভর্তুকিতে ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার কৃষকদের দিচ্ছে।
ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে মন্ত্রী আরও বলেন, কৃষিমন্ত্রী হিসেবে আগাম বন্যা বা আকস্মিক ঢলের কারণে হাওরে বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে প্রতিবছরই আতঙ্কে থাকি। বৃষ্টি আর নাহলে এ বছরের অবশিষ্ট ধানগুলো কৃষকের ঘরে তোলার বিষয়ে আমরা আশাবাদী। পর্যাপ্ত ধান কাটার যন্ত্র হাওরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, দেশের অন্য অঞ্চল থেকেও যন্ত্র আনা হচ্ছে। বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও রাজনীতিবিদরা কৃষকের পাশে রয়েছে।
বৈশাখী বাঁধ পরিদর্শনকালে স্থানীয় কৃষকদের পিআইসি গঠন, বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ শোনেন মন্ত্রী এবং এসব অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমার কাছে খবর আছে, বাঁধের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে শুরু হয়। পিআইসি তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করে তাতে বাঁধ নির্মাণে অনেক অনিয়ম হয়। আমি ঢাকা থেকে শুনে আসছি পিআইসি গঠনে বিভিন্ন অনিয়ম হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে ভূমিহীনদের পিআইসি কমিটিতে রাখা হয়। যা কোন ভাবেই বরদাস্থ করা হবে না।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন ছাতক—দোয়ারাবাজারের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, সুনামগঞ্জ—সিলেট সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুল ইসলাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বেনজীর আলম, ধান গবেষণা ইস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর, পরমাণু কৃষি গবেষণা ইস্টিটিউটের মহাপরিচালক মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোশারফ হোসেন খান, জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন সিলেট অঞ্চলের পরিচালক মো. রকিব উদ্দিন, বাংলাদেশ কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কলসুম স্মৃতি, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন, দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুর রহমান মামুন, দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সিরাজউদ্দোলা তালুকদার, অ্যাড. সোহেল আহমদ ছইল মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ রায় প্রমুখ।
পরির্দশন শেষে সংসদ সদস্য অসুস্থ ড. জয়া সেনগুপ্তাকে দেখতে যান কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক। সেখানে প্রয়াত জাতীয়নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ড. জয়া সেনগুপ্তার সাথে হাওর রক্ষা বাঁধ, নদীখননসহ অন্যান্য বিষয়ে মতবিনিময় করেন কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক।
পরে কৃষিমন্ত্রী সদর উপজেলার জাওয়ার হাওরে স্বল্পজীবনকালীন আগামজাত বিনাধান—১৭ এবং উচ্চফলনশীল ব্রিধান ৮৯ কর্তন ও কৃষকদের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। এসময় তিনি ধান কাটার উদ্বোধন করেন ও ধান কাটার যন্ত্র ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও রিপার’ কৃষকের মাঝে বিতরণ করেন।
অপরদিকে বিকালে মন্ত্রী শহরতলীর মাইজবাড়িতে প্রয়াত সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। পরে পশ্চিম পাড়া ঈদগাহ মাঠে এলাকাবাসীর সাথে মতবিনিময়ন করেন। এসময় বিরোধীদলীয় হুইপ অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ উপস্থিত ছিলেন।
- কৃষিমন্ত্রীকে বাঁধে অনিয়মের কথা জানালেন দিরাইয়ের কৃষক
- গাছে গ্রাফটিং করে ‘চেরি টমেটো’ও ‘টম আলু’ উৎপাদন


