বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নতির বিষয়টি সামনে এসেছে

বিশেষ প্রতিনিধি
হাওরে বাঁধের কাজে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন, কাজে অনিয়ম, অসময়ে কাজ সম্পন্ন করণ এসব বিষয় গত তিন দিন হয় সুনামগঞ্জ জেলাজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়েছে। বুধবার হাওর বাঁচাও আন্দোলন ও জেলা বিএনপির মিছিল মানববন্ধনেও বাঁধের কাজে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচীতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে অনিয়ম, পিআইসির নামে মধ্যস্বত্বভোগীদের টাকা লোপাটের বিষয়টিও ওঠে এসেছে। বিকালে ধর্মপাশার এক পিআইসির টাকা সেখানকার উপজেলা পরিষদের ঘনিষ্ট একজন হাতিয়ে নেবারও অভিযোগ ওঠে।
ধর্মপাশার জয়শ্রী ইউনিয়নের বাদে হরিপুর গ্রামের কৃষক উজ্জ্বল মিয়া এমন অভিযোগ করেন। উপজেলার রুই প্রকল্প হাওর রক্ষা বাঁধের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসির) সভাপতি তিনি। হাওরে বাঁধের কাজ চলমান অবস্থায়ই মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় ধর্মপাশা সোনালী ব্যাংক থেকে বাঁধের তৃতীয় কিস্তির টাকা উঠাতে যান তিনি। ব্যাংকে গিয়ে তিন লাখ ছয় হাজার সাত’শ টাকার চেক দেবার পর ক্যাশ অফিসার তার চেক ক্যাশ করা যাবে না বলে ফিরিয়ে দেন। পরে একই ইউনিয়নের ভাদরপুর গ্রামের মোকলেছ মিয়া এসে বলেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলে দিলে টাকা দেবে ব্যাংক। এক পর্যায়ে কৌশলে পিআইসি সভাপতি উজ্জ্বল ও সচিব সাদ্দামের স্বাক্ষর করা চেক মোকলেছ তার হাতে নিয়ে নেয়, ব্যাংক কর্র্তপক্ষও চেক ক্যাশ করে দেন। টাকা উঠানোর পর মোকলেছ টাকা নিয়ে রওয়ানা হলে উজ্জ্বল বাধা দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পারেন নি, টাকা নিয়ে চলে যায় মোকলেছ মিয়া। মোকলেছ মিয়ার বাড়ি একই ইউনিয়নের ভাদরপুর গ্রামে। এরপর গত দুই দিন ধরে বাড়ি ফিরছেন না উজ্জ্বল মিয়া। বললেন, ‘লেবাররা টাকার জন্য বসে আছে, আমি টাকা ছাড়া বাড়ি গেলে আমাকে মারধর করবে লেবাররা।’ বিষয়টি কৃষক উজ্জ্বল বুধবার বিকালে জেলা প্রশাসককে জানান। জেলা প্রশাসক তাকে ( উজ্জ্বলকে) থানায় সাধারণ ডায়রি করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ধর্মপাশা সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বললেন, উজ্জ্বল মিয়ার চেকটি আটকে রাখার জন্য উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফোন দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার কাছে লেবাররা টাকা পায়, মানবিক কারণেই বিষয়টি সমাধান হবার পর টাকা দেবেন। পরে আমি চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে কথা বলে চেক অনার করে দেই।
সুনামগঞ্জে হাওররক্ষা বাঁধের কাজে কৃষকের নাম ব্যবহার করে এ ধরণের ঘটনা এর আগেও হয়েছে। গত তিনদিনে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধে একের পর এক বিপর্যয়ের পর বাঁধের কাজে অনিয়ম, টাকা লোপাটের ঘটনাও সামনে এসেছে।
ধর্মপাশার পিআইসি সভাপতি উজ্জ্বল মিয়ার টাকা হাতিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে মোকলেছ মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বললেন, এই টাকা প্রসঙ্গে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুকন অবগত আছেন। আমি এই পিআইসিতে শেয়ারে আছি। মঙ্গলবার আমি কোন টাকা নেই নি। আপনি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলুন।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে এই বিষয়ে জানার জন্য কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। ঘণ্টাখানেক পর উজ্জ্বল মিয়াই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে ফোন ধরিয়ে দেন। চেয়ারম্যানের কাছে কৃষক উজ্জ্বল মিয়ার টাকা কেন মোকলেছ নিয়ে গেলেন জানতে চাইলে, তিনি বলেন, আমার বিষয়টি জানা নেই, আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি বলেই ফোন কেটে দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আবার মোকলেছ মিয়ার ফোনে কল দিলে, মোখলেছ মিয়া জানান, চেয়ারম্যান দূরে চলে গেছেন।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, পিআইসি সভাপতি উজ্জ্বল মিয়া ফোন দিয়ে তাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি এই বিষয়ে থানায় জিডি করে পিআইসি সভাপতিকে বাঁধে যাবার পরামর্শ দিয়েছেন। পিআইসি সভাপতি উজ্জ্বল মিয়া জানান, এই প্রকল্পে পাউবো ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ধর্মপাশার চন্দ্র সোনার থাল হাওরের ডুবাইল অংশ ডুবে যাবার পর ওখানকার পিআইসি সভাপতি মো. নুরুল হুদাকে নিয়ে কথা ওঠেছে। স্থানীয়রা বলেছেন, সংলগ্ন হাওরের কৃষককে পিআইসিতে যুক্ত করার বিধান থাকলেও নুরুল হুদার এই হাওরে এক ছটাক জমিও নেই।
হাওরপাড়ের কৃষক কালা মিয়া বলেছেন, অন্য এলাকার নুরুল হুদাকে পিআইসি সভাপতি করায় বাঁধের কাজে দরদ ছিল না তার। বাঁধ দুর্বল করেছে, পানি আসতেই প্রথম ধাক্কায় বাঁধ ভেঙেছে।
স্থানীয় সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোকারম হোসেনও বললেন, বাঁধ একেবারেই দুর্বল ছিল। এ কারণেই বাঁধ ভেঙেছে বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ধর্মপাশার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইমরান হোসেন বললেন, নুরুল হুদা’র সকল কাগজপত্র যাচাই করেই তাকে পিআইসি সভাপতি করা হয়েছে। সুনামগঞ্জে ৫৩৭ কিলোমিটার হাওর রক্ষা বাঁধ এবার ৭২৭ পিআইসিকে দিয়ে করানো হয়।
এদিকে, বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মে একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে দাবি করেছে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি। বুধবার সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় দলের আয়োজনে মানববন্ধন কর্মসূচীতে এই দাবি করা হয়।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. নুরুল ইসলাম নুরুলের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সাংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, সহ সভাপতি নাদীর আহমদ, রেজাউল হক, আবুল মনসুর শওকত, অ্যাড. শেরনুর আলী, অ্যাড. মাশুক আলম, অ্যাড. আব্দুল হক, আনিসুল হক, আবুল কালাম, যুগ্ম সম্পাদক নূর হোসেন, অ্যাড. জিয়াউর রহিম শাহিন, সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম, গোলাম আমবিয়া মাজবুর পাবেল প্রমুখ।
মানববন্ধনে সাবেক সাংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা থেকে যে বোরো ধান উৎপাদন হয় এটা বাংলাদেশের জন্য জরুরি, কৃষক পরিবারের জীবিকার জন্য জরুরি। কিন্তু এই ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। সুতারাং হাওরের কৃষকদের ধান রক্ষার্থে কোটি টাকার যে ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল সেটা কৃষকদের কাজে লাগছে না। তিনি বলেন, ফসল রক্ষা বাঁধের প্রকল্পে যে কোটি টাকার উপরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এটা কার কার পকেটে গেছে, পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে।
ওদিকে, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অনিয়ম ও ব্যাপক দূর্নীতির কারণে ফসল ডুবির প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে বুধবার বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির আয়োজনে শহরের আলফাত স্কয়ার থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় আলফাত স্কয়ারে এসে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়। প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, কেন্দ্রীয় হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহীন চৌধুরী শুভ, হাওর বাঁচাও আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন সহ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা।
প্রতিবাদ সমাবেশে কেন্দ্রীয় হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ফসল রক্ষা বাঁধের জন্য সরকারের দেওয়া ১শ ২১ কোটি টাকা কোথায় গেল। আজ কেন প্রশাসন,পানি উন্নয়ন বোর্ড কৃষককে ডাকেন হাওরের বাঁধ রক্ষা করার জন্য। এই বছরের হাওর রক্ষা বাঁধের লুটপাট ২০১৭ সালকেও হার মানিয়েছে। তিনি বলেন, হাওর এলাকায় কোন নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। পুরাতন বাঁধেই কিছুটা মাটি ফেলা হয়েছে। সরকারের বরাদ্দকৃত টাকা সরকারকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। তা না হলে আমরা কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা জানান।
বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশের আগে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাকর্মীরা অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অনিয়ম ও ব্যাপক দূর্নীতির অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেন।