বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব

এস ডি সুব্রত
সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত প্রিয় বাংলাদেশ। তাজা প্রাণ আর সম্ভ্রমের বদৌলতে অর্জিত একটি ভূখ-, একটি দেশ প্রাণের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পূর্বে এ ভূখন্ডের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বঙ্গ। কখনো বঙ্গদেশ। তাহলে এর নাম বাংলাদেশ হলো কিভাবে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা আর বঙ্কিমের বঙ্গ দেশই আজকের বাংলাদেশ। ইতিহাস মতে বাংলা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত শব্দ বঙ্গ থেকে। আর্যরা বঙ্গ বলে ডাকত এ অঞ্চল কে। মুসলমান শাসনামলে বিশেষ করে ১৩৩৬ থেকে ১৫৭৬ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চল পরিচিতি পায় বাঙাল বা বাঙালাহ নামে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলা বিহার উড়িষ্যা আসাম নিয়ে গড়ে তুলেন বঙ্গ প্রদেশ। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের নাম হয় বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। ১৯৪৭ সালে বঙ্গ দেশ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তানে যুক্ত হলে পূর্ব বাংলা হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। সেই সময় থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলা। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এ অংশটি কে ঐতিহাসিক ভাবে বঙ্গ নামে ডাকা হলেও রাজনৈতিক ভাবে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি এসেছে দেশ স্বাধীনের প্রারম্ভিক কালে। বাংলাদেশ শব্দটি কিভাবে এল সে বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ডঃ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ……“১৯৩০ এর দশকে বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করেছিলে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাজনৈতিক ভাবে এ শব্দটি ব্যবহারের একটা ইতিহাস আছে। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট পাকিস্তান সংবিধান সভায় শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তান বলার সরকারি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। আর যদি নাম পরিবর্তন করতেই হয় তাহলে জনমত যাচাই করা হয়। পাকিস্তান সরকার তা শুনেনি।”
মুনতাসীর মামুন এর মামুনের “বঙ্গবন্ধু কিভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন” গ্রন্থে এ সংক্রান্ত একটি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর কলকাতা থেকে একটি দল ঢাকায় এসেছিলেন যে দলে অন্নদা শংকর রায়ও ছিলেন। তারা দেখা করতে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে। অন্নদা শংকর রায় লিখেছেন …..
শেখ সাহেব কে আমরা প্রশ্ন করি “বাংলাদেশের” আইডিয়াটা কবে আপনার মাথায় এল?
বঙ্গবন্ধু তখন মুচকি হেসে বললেন, সেই ১৯৪৭ সাল আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎ চন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙালির এক দেশ। বাঙালিরা এক হলে কি না করতে পারে! তারা জগত জয় করতে পারে। বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন। তারপর বিমর্ষ হয়ে বললেন, দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরলেন সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজী নয় তাদের প্রস্তাবে। তারা হাল ছেড়েছেন। আমিও দেখি আর কোন উপায় নাই। ঢাকা চলে এসে নতুন করে শুরু করি। তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই। কিন্তু আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা। সেই স্বপ্ন কেমন করে পূরণ হবে এই আমার চিন্তা। হবার কোন সম্ভাবনাও ছিল না। লোকগুলো যা কমিউনাল! বাংলাদেশ তাই বললে সন্দেহ করতে। হঠাৎ করে একদিন রব উঠল আমরা চাই বাংলা ভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে। ভাষা ভিত্তিক আন্দোলন কে একটু একটু করে রূপ দেই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে একদিন আসে আমার দলের লোকদের কে জিজ্ঞেস করি আমাদের দেশের নাম কি হবে? কেউ বলে পাক বাংলা, কেউ বলে পূর্ব বাংলা, আমি বলি না, বাংলাদেশ। তারপর আমি শ্লোগান দেই জয় বাংলা। তখন ওরা বিদ্রুপ করে বলে জয় বাংলা না জয় মা কালী! কি অপমান! সে অপমান সেদিন আমি হজম করি। আসলে ওরা সেদিন বুঝতে পারেনি। জয় বাংলা বলতে আমি বুঝাতে চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয় যা সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে।”
১৯৫৭ সালে করাচীতে পাকিস্তান গণপরিষদের তরুণ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান নামের বিরোধীতা করেন। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলার একটা ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। তাই যদি পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখতেই হয় তাহলে বাংলার মানুষের জনমত যাচাই করতে হবে। গণভোট দিতে হবে। ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে নিউক্লিয়াস নামে ছাত্রলীগের একটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে যারা স্বাধীনতা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করত। ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব বিরোধী গণ আন্দোলন শুরু হয় সে সময় শ্লোগান দেয়া হয়, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। ওই সময় পূর্ব বাংলাকে বাংলাদেশ বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী তে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন আমাদের স্বাধীন দেশটির নাম হবে “বাংলাদেশ”। আওয়ামীলীগ নেতারা এ বৈঠকে বিভিন্ন নাম প্রস্তাব করলেও শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ নামটা এক বাক্যে সবাই গ্রহণ করেন। সেদিন সেখান উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ। এ সময় তোফায়েল আহমেদ বলেন……..“বাংলা একাডেমিতে এই স্মরণ সভা বঙ্গবন্ধু জানান, দেশ স্বাধীনের পর নাম বাংলাদেশ রাখা হবে। এমনকি সেদিন তিনি শ্লোগান দিয়েছিলেন “আমার দেশ, তোমার দেশ বাংলাদেশ”। জানা যায় সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে এই বাংলাদেশ নাম দেয়ার কারণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ………. ১৯৫২ সালে সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বাংলা ভাষা থেকে ‘বাংলা’ এবং স্বাধীন দেশের আন্দোলন সংগ্রাম থেকে ‘দেশ’। এই দুটি ইতিহাস ও সংগ্রামকে এক করে “বাংলাদেশ” করা হয়। এ প্রসঙ্গে কারাগারের রোজনামচা বইয়ে বঙ্গবন্ধুর উক্তি ছিল এরকম ….. “ওইদিন আলোচনায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এক সময় এদেশের বুক হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। একমাত্র বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোন নামের সাথে বাংলার অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। জনগণের পক্ষ হইতে আমি যেটা করিয়াছি আজ হাতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধু মাত্র বাংলাদেশ মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার যে ঘোষণা প্রচার করেন তাতে বলা হয় এই দেশের নাম হল বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যখন সংবিধান প্রণীত হয় সেই সময় দেশটির সাংবিধানিক নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক