কামরুল জাহাঙ্গীর
গতকাল রাত (সোমবার) থেকে মন খারাপ হয়ে আছে। আসলে মন্দ কিছু শুনলে বা জানলে মন খারাপ হয়ে যায় যে কারোরই। আমি জানি আমার মতো আরও অনেকেরই এই সংবাদ শুনে মন খারাপ হয়েছে। তাওসিফ মোনাওয়ার নামের এক তরুণের ফেসবুক পোস্ট থেকে জানা গেল, সুনামগঞ্জের উদীয়মান ফুটবলার ফয়সল নাকি ফুটবল খেলার নেশা ও ভালবাসা ছেড়ে পুলিশের চাকুরিতে যোগ দিয়েছে। না, পুলিশের কোন উচ্চ পদে নয়। নিতান্তই কনস্টেবল’র এর চাকুরি। ফয়সল এখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এই খবরটিই মন খারাপের আসল কারণ। না, ভুল বুঝবেন না। পুলিশের চাকুরী গ্রহণের জন্য নয়। বরং আমি মনে করি পুলিশ বাহিনীতে চাকুরি করা যে কারও জন্যই গৌরবের। মন খারাপের আসল কারণ হলো ফয়সলের ফুটবল ছেড়ে দেওয়া। বলা যায় ফুটবল ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়ার মতো এক অসহায় আত্মসমর্পনের জন্য এই মন খারাপ।
সুনামগঞ্জের আরপিননগরের ছেলে ফয়সল নিজের অসামান্য ফুটবল মেধা ও নৈপুণ্য দিয়ে মন কেঁড়েছিল বেশ আগেই। তাকে ইংল্যান্ডের ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডে প্রশিক্ষণ করিয়ে এনেছে বাফুফে। সে ছিলো বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব ১৬ দলের গোলকিপার। বয়সভিত্তিক এই দলটি গত সাফ গেমসে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করে এনেছিলো। ভারতের বিরুদ্ধে ফাইনালে খেলা যখন ট্রাইব্যাকারে গড়ায় তখন ফয়সলের অসামান্য মনসংযোগ ও দক্ষতার কারণে ট্রাইব্যাকারে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ অনুর্ধ্ব ১৬ দলটি ফুটবলের সাফ চ্যাম্পিয়নের ট্রফি হাতে তুলতে পেরেছিলো। আমরা দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে তখন ফয়সলকে নিয়ে ফিচার, সংবাদ ও সম্পাদকীয় মন্তব্য লিখে আগামী দিনের এই ফুটবল তারকাকে শুভাশীষ জানিয়েছিলাম। শুধু তখনই নয়, ফয়সল যখন ম্যানচেষ্টারের জন্য মনোনীত হলো তখন তাকে নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ আমরা সুনামগঞ্জের একটি প্রস্ফুটন্মুখ কলির পুরোপুরি ফুটে উঠাকে শুরু থেকেই অভিনন্দন জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু হায়! তখন কি জানতাম ‘অভাব’ নামক এক কীট ফুলের সুরভী শুষে নিতে সব সময় মুখ বাড়িয়ে থাকে।
ফয়সল সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়নি। নিতান্তই সাধারণ পরিবারে জন্ম তার। দুনিয়ার তাবৎ মেধাবী ও নামকরা মানুষের তালিকা করলে দেখা যাবে এদের অধিকাংশই উঠে এসেছেন সমাজের নি¤œস্তর থেকে। সংগ্রাম ও অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তাঁরা উঠে এসেছেন সফলতার স্বর্ণ শিখড়ে। ফয়সলের বাল্যবস্থায়ই তার ভিতরে একজন বড় ফুটবলার হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো অভাব তাকে গ্রাস করে নিতে পারে এমন অসম্ভব চিত্র তাই আমাদের দূরতম চিন্তার মধ্যেই ঠাঁই পায়নি। কিন্তু আজ তাই সত্য হতে চলেছে। ফয়সলের ফুটবল প্রতিভা অকালে বিনাশ হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। আমরা কি চেয়ে চেয়েই দেখব আগামী দিনের এক তারকার তারকা হয়ে উঠার আগেই পতনের দৃশ্য? 
ফয়সল পুলিশে চাকুরী নিচ্ছে পরিবারের অস্বচ্ছলতা ঘুচানোর জন্য, অন্তত এইটুকুই ধারণা করা যাচ্ছে এখন। তার মানে অনুর্ধ্ব ১৬ জাতীয় দলের এক প্রতিভাবান গোলকিপারকে দারিদ্রতার অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। এটি অবিশ্বাস্য। আমরা দেখেছি ক্রিকেট প্রতিভা লালন করতে বিসিবি কত কিছু করে। মোস্তাফিজ নামক বিস্ময় বালককে ইনজুরি থেকে ফিরিয়ে আনতে বিসিবি অঢেল টাকা খরচ করছে। এই সেদিন মিরাজ নামের আরেক তরুণ বা হাতি স্পিন জাদু দেখিয়ে ইংল্যান্ডকে অভিজাত টেস্ট ম্যাচে পরাজয়ের স্বায় দেয়ায় সে এখন সকলের চোখের মনি। তাহলে একটি সাফ প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক এনে দেয়ার কৃতিত্বের জন্য ফয়সল কেন এই সমর্থন পাবে না? বিনয়ের সাথে প্রশ্ন আমাদের, ফুটবল কর্তাদের কাছে। তাঁরা কি ফয়সলের এই পতনের খবর রাখতেন না? নাকি বাংলাদেশ ফুটবলকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে? জনপ্রিয়তার বিবেচনায় এখনও সারা পৃথিবীর এক নম্বর খেলা ফুটবলে কেন এমন বিমাতাসুলভ আচরণ সেটিও পরিস্কার হওয়া দরকার জাতীয় স্বার্থে।
আগে দেশে যখন জমজমাট লীগের প্রচলন ছিলো তখন সার্ভিস সেক্টরের টিমগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতো। আমার জানা মতে বাংলাদেশ পুলিশেরও একটি দল ছিল। আমার জানার মধ্যে ভুল হলেও কিছু আসে যায় না। কারণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে যে দল থাকতো সেটি সকলেই জানেন। কিন্তু এখন আগের সেই রামও নেই সেই অযোধ্যাও নেই। সার্ভিস টিম দূরে থাক জেলা বা জাতীয় পর্যায়ে এখন সাংবাৎসরিক ফুটবল লীগও আয়োজন হয় না। যেখানে প্রতিযোগিতা নেই সেখানে খেলোয়াড় তৈরি হবে কীভাবে এমন এক উদ্ভট বাস্তবতায় আমরা গণমানুষের খেলা ফুটবলের সম্প্রসারণ কামনা করছি। হতাশা এখানেই। আগের মতো সার্ভিস টিমগুলো থাকলে ফয়সলের জন্য আমার কোন দুশ্চিন্তা থাকতো না। ফয়সল হয়তো পুলিশ টিমে খেলেই নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারতো। কিন্তু এখন ফয়সল কীভাবে নিজের ফুটবল সত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখবে? সংশয়টা আমাদের ঠিক এই জায়গায়।
হ্যা,ঁ পুলিশ বিভাগ ইচ্ছা করলে অসীম সম্ভাবনার এই প্রতিভাকে লালন করতে পারেন। তাঁরা যদি ফয়সলকে চাকুরির দৈনন্দিন বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিয়ে কোন উপায়ে ফুটবলে জড়িত রাখেন তাহলেই কেবল ফয়সলকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আমরা জানি না পুলিশ বিভাগের নজরে এই লিখাটি পড়বে কিনা। যদি সদাশয় কারও নজরে পড়ে তাহলে আমাদের অনুরোধ, বহু জাতীয় গর্বের অংশীদার এই পুলিশ বাহিনী, ফয়সলকে আপনারা হারিয়ে যেতে দিবেন না। সহজাত প্রতিভা বিনাশ করা আর আত্মহত্যা সমান কথা। ফয়সলকে বিকশিত করার মধ্য দিয়ে আপনারা জানিয়ে দিন, আপনারা একটি প্রতিভাকে লালন করছেন। একটি কলিকে প্রস্ফুটিত ফুলের সৌন্দর্য দান করছেন। প্লিজ প্লিজ প্লিজ …..।


