বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্য মৃৎশিল্প ধরে রেখেছে জগন্নাথপুরের নারীরা

জগন্নাথপুর অফিস
জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের হাওরবেষ্টিত কুবাজপুর গ্রামের পাল বংশের অধিবাসীরা বংশপরস্পরায় মাটির বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সময়ের পালাবদলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। তবে পাল সম্প্রদায়ের নারীরা এ পেশা ধরে রেখেছেন। তাদের তৈরি মাটির মৃৎশিল্প উপজেলার গন্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি হচ্ছে। যাচ্ছে সুদূর লন্ডনেও।
গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, কুবাজপুর গ্রামটি পাল সম্প্রদায়ের আদি নিবাস। দুই শতাধিক পাল সম্প্রদায়ের লোকজনের বসতি থাকলেও গ্রামটিতে এখন মাত্র ৩০ পরিবারের বসবাস। তাদের মধ্যে অধিকাংশ পরিবারের গৃহকর্তা অন্য পেশায় জীবিকা খোঁজলেও নারীরা মৃৎশিল্পের কাজ করছেন নিয়মিত।
সম্প্রতি কুবাজপুর গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের পাল সম্প্রদায়ের নারীরা হাড়ি, পাতিল, থালা বাসন, সানকি, ঘটি, মটকা, মাটির তৈরি ব্যাংক, ফুলের টব, পুতুল, ছাইদানি, কলকি, হুক্কা, খেলনা সামগ্রী বানানোর পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা পার্বণের যাবতীয় বাসনপত্র ও দেব দেবীর প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। কাজের ফাঁকে কথা হয় কুবাজপুর গ্রামের প্রয়াত পুতুল পালের স্ত্রী সুমতি পালের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করে এ বাড়িতে আসি। এখন আমার বয়স সত্তর বছর। শ্বশুর শ্বাশুড়ির কাজ থেকে শেখা এসব কাজ ধরে রাখার চেষ্টা করছি। ধারাবাহিকতায় আমার ছেলের বউয়েরাও এসব কাজ করছে।
কুমার সম্প্রদায়ের গৃহবধূ সুচিত্রা পাল বলেন, মাটির তৈরি জিনিস পত্রের কদর এখনো শেষ হয়ে যায় নি। তবে এসব বানাতে আগের মতো এটেল মাটি পাওয়া যায় না। মৃৎপাত্র তৈরিতে এটেল যুক্ত কাদামাটির ব্যবহার করতে হয়। মাটিগুলো রোদে শুকাতে হয়। তারপর আগুন দিয়ে তাপ দিতে হয়। কিছু দিন রাখলে টেকসই হয়। এতে করে সময় ও ব্যয় দুটি বাড়ে। বাজারে কমদামে প্লাস্টিক সামগ্রী পাওয়া যাওয়ায়, আমাদের তৈরি জিনিসপত্রের দাম পাওয়া যায় না।
মৃৎশিল্পের কারিগর সুমন পাল বলেন, পূজা পার্বন ও বাঙালির বিভিন্ন উৎসব ও মেলায় আমাদের তৈরি মৃৎশিল্পের জিনিসপত্র বিক্রি হলেও আগের মতো চাহিদা না থাকায় আমি শুধু মৌসুমে এসব কাজ করি। অন্য সময় পান সুপারি বিক্রি করে সংসার চালাই।
প্রবীণ মৃৎশিল্পী ধনঞ্জয় পাল বলেন, এখনো সখের বশে লোকজন মাটির তৈরি জিনিস পত্র ক্রয় করেন। প্রবাসীরা দেশে আসলে ফুলের টবসহ মাটির তৈরি জিনিস পত্র সুদূর লন্ডনেও ক্রয় করে নিয়ে যান। তিনি বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মৃৎশিল্প কে বাঁচিয়ে রাখা যাবে।
রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কুবাজপুর গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাল সম্প্রদায়ের লোকজন দেশে ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে অল্প সংখ্যক লোকের বসতি। তাদের কারণে গ্রামটি এখনো বিখ্যাত। তাদের তৈরি মৃৎশিল্পের কদর এখনো রয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কুমার দেব বলেন, কুবাজপুরের পালসম্প্রদায়ের লোকজন গ্রাম বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মৃৎশিল্পীদের তৈরি সৌখিন জিনিসপত্র এখনো বাসাবাড়িতে শোবিজে দেখা যায়। তিনি এ শিল্পের সাথে জড়িত নারীদের পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানান।