Deprecated: Required parameter $month follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $day follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $year follows optional parameter $hour in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/bangla-date-display/uCal.php on line 146

Deprecated: Required parameter $display_count follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292

Deprecated: Required parameter $total_shares follows optional parameter $sharing_type in /home/sites/30a/d/d0e954554d/archive/wp-content/plugins/sassy-social-share/public/class-sassy-social-share-public.php on line 292
বাইশের বন্যার ভয়াল স্মৃতি – সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক

বাইশের বন্যার ভয়াল স্মৃতি

খলিল রহমান
১৬ জুন, ২০২২। বেলা করেই আজ বেড়িয়েছি। ১২টা হবে। কাজীর পয়েন্টে এসে পানি দেখি। এটাতে মনে ধরেনি। কিন্তু সামনে এগুনোর পর উকিলপাড়ায় সড়কে পানি দেখে ভাবি, বন্যা তাহলে হয়েই গেল। আগের পানি বাড়ছে রিপোর্ট দিয়েছি। থানার সামনে গিয়ে উত্তরের সড়কে হালকা পানি দেখলাম। ময়লা পানি। নদীর নাকি বৃষ্টির বুঝতে পারিনি। অফিসে গিয়ে বন্যার রিপোর্টের জন্য নানা জায়গায় ফোন করি। এর মধ্যেই ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। যেন আকাশ ভাইঙ্গা পড়ছে। বন্যা নিয়েই একাধিক রিপোর্ট পাঠালাম। সবশেষ কাগজের জন্য একটি মেইল করে যখন পৌরবিপনির দুতলা থেকে নামি তখন দেখি নিচে পানি। আমি অবাক। প্রবল বর্ষণ, বজ্রপাত। থামছেই না। পৌরবিপণিতে ২০০৪ সালে সামান্য পানি উঠেছিল। আমি পঙ্কজ দার লাইব্রেরিতে এসে দাঁড়াই। সন্ধা নামছে। বৃষ্টি বাড়ছে। বিদ্যুৎ চলে গেছে। আমি মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখি চার্জ নেই। মোবাইল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রিকশা মিলছে না। অন্ধকার। মানুষ ছুটছে বাড়িঘরে। আমি জালালাবাদ বেকারির সামনে থাকতে থাকতেই দেখি পানি শহরের নাভিমূল আলফাত স্কয়ার ছুয়েছে।
বৃষ্টির জন্য আজ মোটরসাইকেল আনিনি। এখন কিভাবে ফিরব। অটোরকশা, রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আটটা বেজে যায়। কোনো কিছুরই ব্যবস্থা হচ্ছে না। মানুষ যে যেভাবে পারছে বাড়ি ফিরছে। এক পর্যায়ে লাইব্রেরি থেকে স্বপন আমাকে একটি ভাঙা ছাতা দেয়। আমি সেটি নিয়েই বাড়ি পথ ধরি। রাস্তায় কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর পানি। মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে শুরু করেছে। সড়কে সুরমার ¯্রােত ঠেলে বাড়ি ফিরতে রাত ১০টা বেজে যায়। বৃষ্টি থামছে না। বাড়ির সামনের সড়েক পানি চলে এসেছে। আমার ২০০৪ সালের বন্যার কথা মনে পড়ে। এর সঙ্গে বারবান মনে পড়ছিল বিকেলে যখন ছাতকের ইউএনও মাহমুদুর রহমানকে মুঠোফোনে বন্যার অবস্থা জানতে চেয়েছিলাম, তখন তিনি বলেছিলেন, ছাতকের সবাই পানিবন্দী। ছাতকে দাঁড়ানোর মাটি নেই। আমার মনে পড়ে যায়, ২০০৪ সালে ভয়াবহ বন্যার সময়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় একটা নিউজের শিরোনাম ছিল ‘সুনামগঞ্জ দাঁড়ানোন মাটি নেই।’
ঘরবন্দী আমি। একটি মোবাইল বন্ধ। অন্যটিতে সামান্য চার্জ আছে। আমি আমার পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদককে বন্যার বিষয়টি জানিয়ে রাখি। সঙ্গে এও বলি আমার ব্যবহৃত মোবাইলটি বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি ভালো না। রাস্তাঘাট সব তলিয়ে গেছে। তবুও কাল অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করব।
রাত বাড়ে, সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি, পানি বাড়তে বাড়তে এক সময় আমাদের উঠানে চলে আসে। রাত ১২ টায় এলাকার কয়েকজন আত্মীয় নৌকা নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসেন। সবাই দুশ্চিন্তায়। আমাদের ওঠানে পানি, আমি ভাবি শহরের কোনো বাসাবাড়ি বাকি নেই। রাত ভয়ংকর হচ্ছে। চারটার দিকে ঘরে পানি প্রবেশ করে। ঘরে থাকা সবাইকে তখন দুতলায় তুলে দিই। বিশেষ করে নারী শিশুদের। পানি বাড়ে। নিচে ইট দিয়ে খাট ও আসবাব বাঁচানোর চেষ্টা চলে। আতঙ্ক, ভয়, রাস্তায় আসার পথে কোমরপানি ভেঙে, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলা নারী-শিশুদের কথা ভাবতে ভাবতে ভোর হয়।
১৭জুন ২০২২। ভোরের আলো নেই। আছে অন্ধকার।
তখনো তুমুল বৃষ্টি, মুহুর্মুহু বজ্রপাত। যেন ঘরের উপরে, বারান্দায় পড়ছে। জানালা কাপছে। সুনামগঞ্জ বিশ্বের সবচেয়ে বজ্রপাত প্রবণ জেলার যে তকমা পেয়েছে সেটি নিয়ে আর কোনো সন্দেহ রইল না। যে মোবাইলে কিছু চার্জ ছিল সেটি হাতে নিয়ে দেখি নেট নাই। কি করব। অস্থির। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। সহকর্মীদের সঙ্গে যগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছি। ঘরের উঠানে কোমরপানি, রাস্তায় সাঁতার। কি করব। অস্থিরতা বাড়ে। এর মধ্যে প্রথম আলোর বিশাল বাংলা বিভাগের সম্পাদক তুহিন ভাইয়ের একটি খুদে বার্তা দেখি হোয়াটসঅ্যাপে। লিখেছেন,’কি খবর, আপনারে পাইতাছি না’।
আমি সব জানিয়ে ফিরতি বার্তা দিই। কিন্তু তিনি সেটা পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে না। সুনামগঞ্জের অবস্থা কি, মানুষ কেমন আছে। এই খবর যারা দুনিয়াকে জানাবে তাদের মধ্যে আমি একজন। অথচ আমি নিজেই কিছই জানি না। আমি বিচ্ছিন্ন। আমি একা। আমি ঘরবন্ধী।
আমি সিলেটের সহকর্মী সুমনকুমার দাশকে একটা বার্তা দিই। বলি, নিউজ সিলেট থেকে করতে হবে। সঙে এটাও বলি এসএসসি পরীক্ষার বিষয়টাতে যেন গুরুত্ব থাকে। কারণ, পরদিন থেকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। আমি বারবার মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখি। ফিরতি বার্তার অপেক্ষায় থাকি। একসময় ফিরতি বার্তা আসে। আমার বিষয়ে অফিস অবগত। আর এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত। আমি স্বস্তি পাই পরীক্ষা স্থগিতে বিষয়টি জেনে। এরপর এই মোবাইলটিও বন্ধ হয়ে যায়। আমি এখন পুরোপুরি অকর্মা। কারো সঙ্গে আর যোহগাযো নেই। ঘর ভরতি মানুষ। আমি এক কোণায় বসে আছি। আমার স্ত্রী সেটা বুঝতে পারে। শান্তনা দেয় ‘তোমার অবস্থা তো অফিস জানে, তাহলে এ টেনশন করছ কেন।’ আমরা যে কি কষ্ট হচ্ছে সেটি থাকে বোঝাতে পারছি না। আমার চিৎকার করে কাঁদছে ইচ্ছে করছে। আমি সবার থেকে বিচ্ছন্ন। সুনামগঞ্জের খবর জানি না। শহরে কি ঘটছে আমি জানতে পারছি না। কাউকে জানাতে পারছি না। এ রকম অস্থিরতায়, হতাশায় দিন যায়। আবার রাত আসে। গতরাতও ছিলাম মোমবাতির আলোয়। আজ মোমবাতি কম। আলোও কম। ঘুম আসে না। কখন ভোর হবে।
১৮জুন ২০২২। ঘরে এত এত মানুষ। খাবার পানি নেই। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে খাওয়া হচ্ছে। আকাশের কান্না থামছে না। পানি বাড়ছে। তবে কিছুটা ধীরে। যেন আগের দুই দিনের গোসসা কিছটা কমেছে। আজও কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না। খাটের ওপর গা এলিয়ে আছি। আমার কোনো কাজ নেই। তবে চিন্তা আছে। কান্না পাচ্ছে। শহরের কতশত মুখ চোখে ভাসে। কে কোথায়, কিভাবে আছে। কারো কোনো ক্ষতি হয়নি তো। আচ্ছা ইন্টারনেট সেবা কেন বন্ধ হলো। অন্য কোনো বিকল্প উপায়ে কি যোগাযোগ করা যায় না। বিকেলে বৃষ্টি কিছটা কমে। আমার একটা নৌকা চাই। আমি বের হবই। অবশেষে আমার এক ছোটভাই পাড়ার পয়েন্টে প্রায় সাঁতরে গিয়ে একট নৌকা জোগার করে নিয়ে এসেছে। আমি বের হলাম। যেদিকে যাই শুধু পানি আর পানি। মানুষের বাসাবাড়িগুলো সুনাসন। যেসব বাসা একতলা তার কোনোটিতেই মানুষ থাকার অবস্থা নেই। রাস্তায় নৌকায় করে মানুষজন এখানে-ওখানে যাচ্ছে। একে অপরের খোঁজ নিচ্ছে। আমি লজ্জা পাচ্ছি। এই দুদিন আমি ঘরে ছিলাম। আহা, মানুষের কত কষ্ট। বৃষ্টি কমায় মানুষজন দুদিন পর বাড়ির ছাদে উঠেছেন। নারী-শিশুরা বাড়ি ছাদ থেকে যতদুর চোখ যায় পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। আমি সোজা গেলাম এ আর জুয়েলে বাসায়। বাসায় নৌকা ভিরিয়ে ডাকাডাকি শুরু করি। কিন্তু সে বাসায় নেই। অনেক্ষণ ডাকাডাকির পর খোঁজ মিলল পাশের বাসার তিনতলায়। বন্যার্ত হিসেবে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। সে জানাল, সবার অবস্থা এক। কেউই কাজ করতে পারেনি। সুনামগঞ্জ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। অনেকের সঙ্গে দেখা হলো। মানুষ দেখা হলে এমনভাবে কুশল জানতে চায় যেন কতকাল পর দেখা। আহা জীবন। নৌকার মাঝির বাড়ি ফেরার তারা। তাই আর শহেরর ভিতর দিয়ে যাওয়া হলো না। অথচ আমার ইচ্ছে করছে আমি। সাতার কেটে পুরো শহর ঘুরে আসি। মানুষদেও দুঃখ দুর্দশা দেখে আসি। সেটি হয় না। আবার ঘরে ফিরি। রাত হয়। আলোহীন, ঘুটঘুটে কালো এই রাত বড় লম্বা।
১৯জুন ২০২২। আজকের সকালটা একটু ফর্সা। বৃষ্টি নেই আবার রোদও নেই। দুদিনের অঘুমা থাকায় ঘুম ভেঙ্গেছে দেরিতে। দুপুরের পর প্রতিবেশি এক ভাগনা আসে। সে বিদ্যুৎ মিস্ত্রির কাজ করে। সে নাকি সৌরবিদ্যুতের প্যানেলে ইনোভেটর দিয়ে মোবাইলে চার্জ দিতে পারবে। আমার অবস্থা দেখে সে এটি কোথায় থেকে জোগার করে নিয়ে এসেছে। আমি তাকে মোবাইল দিই। ঘণ্টাখানেক পর ব্যাটারি কিছুটা চার্জ হওয়ার পর সেটি নিয়ে আসে। আমি মোবাইল নিয়ে তিনতলার ছাদে উঠি। চেষ্টা করি, কিন্তু কারো সঙ্গেই সংযোগ হয় না। ছাদে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখি। সময় যায়। হঠাৎ হোয়াটসঅ্যাপে একটা বার্তা ঢুকে। ঢাকা অফিস থেকে, তুহিন ভাই লিখেছেন,‘ খলিল কোথায় আছেন, কেমন আছেন? সুযোগ হলে জানাবেন।’ আমি চমকে উঠি, তাহলে নেটে কাজ করছে। আমি উনাকে ফোন দিই, অফিসের আওে ভাইকে ফোন করি। ফোন যায় না। মনের দুঃখে হোয়াটসঅ্যাপ লিখতে বসি। গতকাল সড়কে বের হয়ে যা দেখলাম। বাড়ির পাশে যা দেখছি। তাই। এরপর আমাদের অফিসিয়াল গ্রুপে সেন্ট করি। গেল না মনে হয়। আমি বসে আছি কারো কোনো সাড়া পাই কিনা। হঠাৎ হোয়াটঅ্যাপে ঢাকা অফিসের হাসনাত ভাইয়ের বার্তা,‘স্টোরি পেয়েছি। ফোন করার দরকার নাই। ম্যেসঞ্জারেই কথা বলব।’ এরপর কথা শুরু। আমার কি আনন্দ। শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে রোরবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রায় ৬০ ঘন্টা বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার যুক্ত হতে পেরে। যাই পারি, আমি লিখছি। সেন্ট করছি। বড় ভালো লাগছে। আমি তিনতলার ছাদ থেকে নামি না। সিলেট থেকে উজ্জ্বল মেহেদী ফোন দেয়। ‘ভালো আছি’ বলার সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আবার ফোন করি, সংযোগ হয় না। আমার ছোট ভাইও সিলেট থেকে ফোন দিচ্ছে। ধরছি, কথা হচ্ছে। আমার গলা কাঁপছে। গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে…।