বাউল উদাসীর কথা

এনামুল কবির
মকদ্দস আলম উদাসীকে প্রথম দেখি ১৯৮৯ সালে, জগন্নাথপুরের কেশবপুরেই; বাড়িটা ছিলো বাউল গানের এক মহৎ সমঝদার শীতাব আলী মেম্বারের। তখন ছিলো শীতকাল। আসর বসেছে তাঁর বাড়ির উঠোনেই। রাতভর গান হয়েছিলো। এখানেই আমি উদাসী ভাইসহ প্রথম দেখি বাউল কপিল উদ্দিন সরকার; বাউল বশির উদ্দীন সরকার, কামার গাঁওয়ের রহিম উদ্দীন সরকার, সুনামগঞ্জের বাউল আব্দুর রশীদ ও কনিষ্ঠ একটি ছেলে- তার নাম- শফিক এবং আরও অনেককে। বলতে কী শফিক যখন গাইলো, মানুষের কী উচ্ছ্বাস! এই সময়ে কিন্তু বেদের মেয়ে জ্যোৎস্নার বাধভাঙ্গা জনপ্রিয়তা চলছে। এদিকে প্রতিটা রাত্রেই কোথাও না কোথাও আয়োজন চলছে বাউল গানের- এটা কম কথা! মানুষ আসলে সবসময়ই গানের মানুষ। আর বাউল গান সে তো চিরদিনের বাঙালিরই। এভাবে বাঙালির তনুমন নাচিয়ে দেওয়ার মতো গান যখন গীত হচ্ছিলো, এক পর্যায়ে এসে ডাক পড়ে বাউল উদাসীর। তিনি- গাইলেন অনেকটা তাঁর দুতারা সহযোগেই। এখানে তিনি পুরোই আলাদা। এখন গানে চলে এলো আরও নিবিড় পারিপার্শ্বিকতা, আটপৌরে জীবন- প্রাত্যহিকতা। শব্দগুলো কেমন সুর হয়ে সপ্রাণ গলে গেলো আর এক ঘোরলাগা বাস্তবতা তৈরি করছিলো। তিনি গাইলেন-

পয়সাওয়লা হয় কাজের কাজী
পয়সা অইলে কয় বাবা
ডাকে- বাবাজী।

অথবা এবার অন্য কোনও গান-
বস্তার ধান ঘাতেদি নিলো
দারুণ উন্দুরে খুঁড়ে মাটি রে
ও ভাই।
এরকম গানে শ্রোতারা বুঁদ হয়ে যান। উচ্ছ্বাসে আর চিৎকার শোনা যায় না, কেমন নিরবতা নেমে আসে চারপাশে। উদাসী থেমে যেতে চাইলে কেবল শোনা যায়, না, আরও গান হবে। তাই উদাসী ভাইও সেরাত একটার পর একটা গান তাঁর এসব উদাসী শ্রোতাদের শুনিয়ে গিয়েছেন।
এরপরে প্রায়ই তাঁকে জগন্নাথপুরে দেখতাম। মনে হয় ৯০ এর পরে তিনি একরকম স্থায়ীভাবে তাঁর পৈত্রিক গ্রাম- চাতকের চরবাড়া থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করেন। তখন জগন্নাথপুর ও আমাদের পাগলায় দুটি গানের স্কুল ছিলো, এগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিক গানের স্কুল ভাবা ঠিক হবে না, আমরা এই দুই জায়গায়, দুই গানের স্কুলে দেখবো দুজন মানুষকে- পাগলায় জমিয়ে আছেন বাউল কপিল উদ্দিন সরকার এবং জগন্নাথপুরে- মকদ্দস আলম উদাসী। উল্লেখ্য যে, এমন স্কুল বা ঘরানায় কপিল উদ্দিনের মতো সফল আর কাউকে দেখা যায়নি। তাঁর শিষ্য ছিলো অনেক। উদাসী বলতে গেলে এখানে ব্যর্থই। হাতে গোনা কয়েকজন হয়তো তাঁর কাছ থেকে দুতারা আর হারমনিয়াম শিখতে পেরেছে, কিন্তু বাউলের সৌন্দর্য আর প্রেমে তারা কেউই বাউল হতে পারেনি।
খেয়াল করেছি কত ভাল-মন্দ মানুষের সাথে উদাসী ভাইয়ের সম্পর্ক। তাঁরা- কেউ কেউ বড়সড় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও। তখনকার সাংস্কৃতিক দিক ও পটভূমির দিক বিচার করলে জগন্নাথপুর কত অগ্রসরই না ছিলো! হয়তো এসব দিকও তাঁকে এখানে স্থানীভাবে বসবাস করতে বা থেকে যেতে উৎসাহিত করবে। এরকমই কোনও একদিন তাঁর সাথে দীর্ঘ আলাপ হয়। তারপর একদিন আমিন মিস্ত্রী বড় ছেলেকে সাথে নিয়ে যাই তাঁর বাসায়। এটা ছিলো বড় দীঘির উত্তরপাড়ে। টিনেরই ঘর, একটা মাত্র রম; ভেঙ্গে- পড়ে পড়ে অবস্থা। এখানেই একা থাকা হয় তাঁর। জানালেন, বিয়েতে তাঁর অমত নেই; সেরকম কাউকে না পাওয়া পর্যন্ত আর কী করা। আমরা গরমে জবুথবু হয়ে বের হই বিকেল চারটাতে, যাই আবার ডাকবাংলা রোড- চা টা খেয়ে তবে ধরি বাড়ির পথ। এরপর থেকে প্রায়ই আমাদের দেখা হতো, বলতে গেলে প্রতিদিনই। অবশ্য সবসময় এমনটা একই থাকেনি, প্রায়ই উদাসী ভাই কোথায় চলে যেতেন, আর ফেরার কথাও একেবারে ভুলে যেতেন। তাই হয়তো দেখা হতো ১৫ দিন বা ১মাস পর। যাইহোক এভাবে কখনও সখনও ব্যত্যয় ঘটলেও আমরা ঠিকই মিলিত হতাম, টুকটাক কথা হতো আমাদের; ফেরার সময় হয়তো কোনও কোনও দিন আমি তাঁকে উপহার দিতাম এক প্যাকেট সিগারেট।
তিনি ছিলেন আসলে ক্ষ্যাপা মানুষ। কিন্তু বুঝতে দিতেন না। সামান্য যাই পড়েছিলেন, তাও মাদ্রাসায়। একটা আত্মগত দ্বন্দ্ব তাঁর মধ্যে সবসময় ছিলো। এসব ভাষা পেতে চাইতো, ভাষার বয়ানে হয়তো একটা অর্থ বা বয়ান দাবি করতে চাইতো; এই জায়গায় তিনি- কথাকার ছিলেন না। এখানে তিনি এদের সুরের প্রলেপ দিয়ে আচ্ছাদিত করতে চাইতেন। তাই হয়তো তাঁর ক্ষ্যাপাটি আড়ালে চলে যেতো আর আমরা দেখতে পেতাম ছোট ছোট কথায় অনেক বড় বড় কথা বলে যাওয়া শিল্পীকে। এটা সুরেরই এক নির্দিষ্ট জগৎ। ক’জন পায় এর সাক্ষাৎ? উদাসী ভাই এখানে পুরোই শিল্পী, তাঁর সাধন-ভজনে পুরোই নির্মাতা; তাঁর এর বাইরে কিছু চাওয়ার নেই। সম্ভবত এর বাইরে তিনি একটা শব্দও বাজে খরচ করেননি। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি উদাসী হতে গেলেন কেন? তিনি বললেন, এটা দুরবীন শাহের কাজ। তিনিই ছিলেন তাঁর গানের শিক্ষক, তাই এটাকে বহন করতে তাঁর আনন্দই হচ্ছে। আর তখনই হয়তো বলতেন, ভাই, লেখেন, লেখেন ভাই। আসা-যাওয়ার মধ্যদিয়ে আমার আব্বার সাথেও তাঁর একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো।
অবশ্য তাঁর সাথে দু-এক বার বড় ধরনের ভুল বুঝাবুঝিও হয়েছে। শেষের দিকটায় সহ্য করাও ছিলো একটু কঠিনই। এটা তাঁরই একটা বই প্রকাশকে কেন্দ্র করে। তাঁর প্রথম প্রকাশনা- পরার জমিন, মোস্তাক আহমদ দীনের সম্পাদনায় সেটা বের হয় ৯৮ বা ৯৯ সালের দিকে। এখন- কোন বই বেরুলে একবার তিনি দীনের সাথে কথা বলবেন না কেন- এই ছিলো আমার জানার জায়গাটুকু। তিনি উত্তর দেননি, চুপ মেরে শুনে গেছেন; অবশ্য পরে আমিও এর উত্তর পেয়ে গেছি। একসময় ফোনে যে কথা হতো আমাদের, তিনি- সুযোগ করে প্রায়ই ফোন দিতেন, আমি কেটে ব্যাক করতাম, তাও হতো না; কেন জানি- বন্ধই হয়ে গিয়েছিলো। তবুও তিনি শান্তিগঞ্জ আসতেন, চা খেয়ে আবার চলেও যেতেন। এই সুযোগটি আজ ছিন্নই হয়ে গেলো। পঙ্কজ দার (তিনি- দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এর সম্পাদক ও প্রকাশক) ফোন পেয়ে যখন জানলাম আমাদের প্রিয় উদাসী ভাই (আজ ভোর ৬.৩০ মি তে দোয়ারা বাজার উপজেলার নরসিংপুরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে) মারা গিয়েছেন!
একজন শিল্পীর আপাত প্রস্তান হলো বটে। এখন তাঁর সৃষ্টিই হবে তাঁর ভিন্নতর জীবন। এখানে কতটা তিনি সংক্রমিত করতে পারেন সেটাই হলো বড় কথা। তাঁর সে সংক্রমন যে কী আমাদের সেটা ভালো করেই জানা৷ আশা করি দ্রুতই যোগ্য কারও সম্পাদনায় বের হবে তার সমগ্র। টেক্সট হিসেবেও উদাসীকে আমরা পড়তে চাই। গুণী- দার্শনিক মন বাউল মকদ্দস আলম উদাসী ভাইয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানাই।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল মহাবিদ্যালয়, জগন্নাথপুর।