সাইদুর রহমান আসাদ
চারদিকে প্রকৃতির সঙ্গে সবুজের মিতালি। যেদিকেই চোখ যায় শুধু সবুজ বাদামের ক্ষেত। দক্ষিণা বাতাসে ছোট ছোট বাদামের গাছ দোল খেয়ে হেলেদুলে পড়ছে। ক্ষেতের একপ্রান্ত থেকে বাদাম গাছ উপরে ফেলে মাটির নিচ থেকে বাদাম বের করছেন শ্রমিকরা। ধীরে ধীরে জমির সবুজতা কমে দৃশমান হচ্ছে নরম বাদামি রঙের মাটি। সোমবার এমনই এক চিত্র দেখা গেছে তাহিরপুরের বালিজুরি গ্রামে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, পুরো জেলায় ১৪১০ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম চাষাবাদ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হয় তাহিরপুর উপজেলায়। এই উপজেলায় ১১৮৫ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম চাষ হয়েছে। এছাড়াও বিশ^ম্ভরপুর উপজেলায় ৬৬ হেক্টর, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ৬৫ হেক্টর, জামালগঞ্জ উপজেলায় ৫৫ হেক্টর, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ২৫ হেক্টর, ধর্মপাশা উপজেলায় ৫ হেক্টর, ছাতক উপজেলায় ৫ হেক্টর ও জগন্নাথপুর উপজেলায় ৪ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম চাষাবাদ হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি গ্রামের বালুপাথরের ব্যবসায়ী সুলেমান ওরফে ফুল মিয়া (৫২)। জাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলনে সরকারি বিধি-নিষেধ থাকায় ব্যবসায় বর্তমানে মন্দা ভাব। তাই আদি পেশা কৃষিকে এখনও আকঁড়ে ধরে রেখেছেন। নিজের জমিতে ধান ও বাদাম চাষ করেন। সেখান থেকে সিজনে প্রায় ৪ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।
একটু নিচু জমিতে বোরো ধান চাষ এবং অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে চাষ করেন চিনা বাদাম। এবার তার ৭ কেয়ার (৩০ শতাংশে ১ কেয়ার) জমিনে বোরো ধান আবাদ করেছেন। এছাড়া ১৮ কেয়ার জমিতে করেছেন চিনা বাদাম চাষ।
সুলেমান ওরফে ফুল মিয়া জানালেন, তার ১৮ কেয়ার জমিতে পৌষ মাসে চিনা বাদাম রোপন করেছিলেন। এখন সে বাদাম তোলার সময় হয়ে গেছে। কেয়ার প্রতি বাদাম উৎপাদন হয় ৪-৫ মন। এক মণ বাদাম বিক্রি করতে পারেন তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়। এতে প্রতি কেয়ার থেকে পনেরো থেকে ষোলো হাজার টাকার বাদাম বিক্রি করতে পারেন তিনি। তবে কেয়ার প্রতি উৎপাদন খরচ হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা তাঁর।
তাঁর ছেলে মো. ইয়াসিন বললেন, হাওরের মাঝে আমরা সবার আগে বাদাম চাষবাদ শুরু করি। প্রথম দিকে কেয়ার প্রতি ৩ মণ করে বাদাম পেয়েছি। তখন আট হাজার টাকা মণ বিক্রি করতে পেরেছি। শেষের দিকে যারা বাদাম চাষ করে তুলেছেন তারা দুই থেকে তিন হাজার টাকা মণ ধরে বিক্রি করতে পেরেছে। জানা যায়, বালিজুরি গ্রামের প্রায় ৬০ জন কৃষক বাদাম চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। বাদাম চাষে লাভবান হওয়ায় প্রতি বছরেই বাদাম চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে অসযোগিতার কথাও জানিয়েছেন অনেক বাদাম চাষি।
বালিজুরি গ্রামের আরেক বাদাম চাষি মো. শাহাবুল মিয়া (৪০)। নিজেও দেড় কিয়ার জমিতে চিনা বাদাম চাষ করেছেন। চিনা বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে তার জমিতে। এজন্য খুশি মনে নিজের বাদাম ক্ষেত দেখছেন। তবে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে আরও বেশি জমিতে বাদাম চাষ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শাহাবুল মিয়া বললেন, বাদাম চাষ করে মোটামুটি লাভবান হওয়া যায়। তাই দেড় কেয়ার জমিতে চিনা বাদাম চাষ করেছি। তবে সরকারিভাবে আমরা কৃষকরা কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাই না। আমাদের গ্রামেই অন্তত ৬০ জন বাদাম চাষি রয়েছে। সবাই বাদাম চাষ করেন। সরকারি সাহায্য সহযোগিতা পেলে আরও অনেকে বাদাম চাষ করবে।
এদিকে এসব বাদাম ক্ষেত থেকে বাদাম তুলতে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামের মহিলারা সন্তানদের নিয়ে বাদাম তুলে দেন। জমির মালিক ছয় ভাগ নিয়ে একভাগ তারা নেবেন এমন চুক্তিতে দল বেঁধে বাদাম তুলেন এসব শ্রমিক। একেক দলে ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক থাকে।
রাজিয়া বেগম এমনই এক শ্রমিক। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে রামিম হোসেন বালিজুরি হাজি এলাহি বক্স উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। দ্বিতীয় মেয়ে জেবিন বালিজুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। আরেক ছেলে এখনও বিদ্যালয়ে ভর্তি করেননি। তার স্বামী জাদুকাটা নদীতে বারকি শ্রমিক। নদীতে বালু পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় তার স্বামীর এখন কাজ নেই। তাই ২ ছেলেকে নিয়ে গেরস্থের জমির বাদাম তুলে দিচ্ছেন তিনি।
রাজিয়া বেগম বললেন, সকাল থেকে বাদাম তুলেছি। এখন বেলা ১১টা বাজে। এই জমিতে বাদাম তোলা শেষ হয়ে গেছে। এখন আরেক জনের জমিতে যাবো। এই কয়েক ঘন্টা বাদাম তুলে ২ ভাগ পাবো। প্রায় তিনশত টাকার বাদাম বিক্রি করতে পারবো।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বললেন, জেলার মধ্যে তাহিরপুরে বাদাঘাট এলাকায় বেশি বাদাম চাষাবাদ হয়। এই চিনা বাদাম সুনামগঞ্জের সব জায়গায় হবে না। একটু উঁচু এলাকায় হয়। জমিতে সামান্য বৃষ্টির কারণে যদি পানি জমে যায় তাহলে গাছ পচে যাবে। একটু বেলে দুআঁশ মাটিতে বাদাম চাষ ভালো হয়। সুনামগঞ্জে দুইটি মৌসুমে বাদাম চাষ হয়। অক্টোবরের শেষের দিকে বীজ বপন করে। সে বীজ থেকে তিন মাস পরে বাদাম উত্তোলন করা যায়। আবার জানুয়ারি মাসে বীজ বপন করে এপ্রিল- মে মাসে বাদাম তোলা হয়। বাদাম চাষের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি আমরা।
কৃষকদের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জে ২৬৩ জন কৃষি উপসহকারি থাকার কথা। এখন পর্যন্ত ৯৩ জন রয়েছেন। যেখানে একটি ইউনিয়নে তিনজন কৃষি উপসহকারি থাকার কথা সেখানে ২ টি ইউয়িনের দায়িত্বে একজন থাকেন। কম জনবল দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে আমাদের। তবে আমরা কৃষকদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি।
- বিদেশি ফল সাম্মাম ও রকমেল চাষ করে আলোচনায় ৩ কৃষক
- সদরগড়ে সড়ক কেটে নৌযানের বেল্ট স্থাপন, চলাচলে বাড়ছে দুর্ঘটনা


