বানভাসির মধ্যে নেই ঈদ ভাবনা

এম.এ রাজ্জাক, তাহিরপুর
কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ভিড় থাকলেও বিক্রি হচ্ছে কম। এবার দাম নিয়ে ক্রেতাদের কোন বাড়তি অভিযোগ নেই। মোটামুটি দামের মধ্যেই রয়েছে কোরবানির গরু। এবার জেলার ১১টি উপজেলায় স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলে প্রায় শতাধিক পশুর হাট বসেছে। এসব হাটে স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের পালিত গরুই বেশি উঠেছে। এবার বন্যার প্রভাবে খামারি এবং কোরবানি গরু পালনকারীরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। তারা মনে করছেন, কোরবানির গরু এবার কম দামে বিক্রি করতে হবে। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, চলতি বন্যায় তাদের গরু শুকিয়ে গেছে। ঠিকমতো খাবার খাওয়াতে পারেননি। যে গরু ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা, সে গরু এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০ হাজার টাকায়। এছাড়াও সম্প্রতি বন্যার প্রভাবে মানুষের মধ্যে নেই ঈদ ভাবনা।
জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে সুনামগঞ্জের কয়েকটি বড় হাওরের একমাত্র বোরো ফসল পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে যায়। সেই রেস কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় দফা ভয়াল বন্যায় ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গেছে। ভাসিয়ে নিয়ে গেছে শত শত গরু, ছাগল, হাঁস ও মুরগী। এসবের উপর ভরসা করে এবার ঈদুল আজহা উদযাপনের চিন্তা ছিল বেশির ভাগ বানভাসি মানুষের। কিন্তু বন্যায় সবকিছু হারিয়ে বানভাসি মানুষ এখন দিশেহারা। কেউ আছেন আশ্রয় কেন্দ্রে আবার কেউবা রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতেই। এদিকে ঈদ দরজার সামনে কড়া নাড়ছে। কিন্তু ঈদের প্রস্তুতি তো দূরের কথা, কোনরকমে দু’বেলা ভাত জোগাড় ও মাথা গোঁজার ঠাঁই করাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে এখন।
মঙ্গলবার সরেজমিন হাওরপারের কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বানভাসি মানুষের চোখে মুখে দুশ্চিন্তার চাপ। কোথাও ঘর ধসে পড়েছে, আবার কোথাও ঘরের বেড়া নেই।
জামালপুর গ্রামের শুক্কুর আলী জানান, চৈত্র মাসে টাকা ধার করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। একটি বড় গরু ছিল, কোরবানির ঈদে বিক্রি করে ঋণ শোধ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। বন্যায় গরু বাঁচাতে পারিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনরকম আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছি। ঈদ কিভাবে করবেন জানতে চাইলে শুকুর আলী বলেন, এবার আর ঈদ হবে না। শুধু শুক্কুর আলী নয় পুরো হাওরজুড়ে একই চিত্র।
মন্দিয়াতা গ্রামের সুফিয়া বেগম বলেন, তার দুইটি ছাগল বানের তোড়ে ভেসে গেছে। হাঁস-মুরগি কিছুই নেই। বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সারা বছরের খোড়াক (খাবার) ধান ও চাল। বানভাসি মানুষের ঈদ ঘিরে যত পরিকল্পনা আর আনন্দ উদযাপনের ইচ্ছা সবই শেষ করে দিয়েছে বন্যায়। এখন শুধু সামনের দিনগুলো কিভাবে কাটবে তা নিয়ে ভাবছেন তারা।
গত রবিবার তাহিরপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় পশুর হাট বাদাঘাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে অধিক সংখ্যায় কোরবানির ছোট বড় গরু উঠেছে। স্থায়ী এ হাট ছাড়াও ঈদকে সামনে রেখে, বালিয়াঘাট নতুন বাজার, জনতা বাজার, বড়ছড়া বাজার, কলাগাও বাজার সহ জেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী পশুরহাট। পশুর হাটে ভিড় দেখা গেলেও ক্রেতারা গরু কেনার ব্যাপারে সময় নিচ্ছেন। বিভিন্ন জাতের ছোট বড় গরু নিয়ে বিক্রেতারা ক্রেতার অপেক্ষা করছেন।
গরু বিক্রেতা শামিম জানান, এবার বন্যার প্রভাবে গরুর দাম কিছুটা কম। তারপরও হাটে আসা গরু বিক্রিতে লোকসান হবে না। সামান্য কিছু লাভ হবে।
হাটে আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, ঈদের আরও কয়েক দিন সময় আছে। এখন বাজার মোটামুটি সহনশীল। হাতে সময় থাকায় তারা এই মুহূর্তেই গরু কিনছেন না।
বাদাঘাট বাজারের ইজারাদার খোকন মিয়া বলেন, আজকের হাটে গরু ক্রয়-বিক্রয় তেমন হয়নি। ছোট ও মাঝারি আকারের কিছু গরু বিক্রি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (আজ) জমজমাট হয়ে উঠবে পশুর হাট।