সু.খবর ডেস্ক
আলো‘কপাল, সবই কপাল। কাউকে দোষ দেব না। দোষটা আমার কপালের’ নিজের মনে পুষে রাখা ক্ষোভ এভাবেই প্রকাশ করল সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ প্রতিযোগিতার শিরোপা জয়ের নায়ক। সিলেট স্টেডিয়ামে সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালের টাইব্রেকারে ভারতের সাকলায়েন খানের শটটি ঠেকিয়ে পুরো দেশকে আনন্দে ভাসিয়েছিল সে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের গোলরক্ষক ফয়সাল আহমেদ ফুটবলই ছেড়ে দিয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ ফুটবলে দেখেনি বলেই কনস্টেবল পদে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশে। বয়সভিত্তিক দলের প্রতিভাবানরা এভাবেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যায় বাংলাদেশের ফুটবলে।
অথচ কত উচ্ছ্বাস, কত প্রশংসা, কত প্রতিশ্রুতির মালাই না গাঁথা হয়েছিল ফয়সালদের ঘিরে। ২০১৫ সালে সাফ জয়ের পর কেটে গেছে দুটি বছর। এই দুই বছরের মাথায় ওই উচ্ছ্বাস-প্রতিশ্রুতি ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। অথচ দারুণ প্রতিভাবান কিছু ফুটবলারের দেখা মিলেছিল ষোলো বছর বয়সীদের সেই দলে। কয়েকজনকে তো মনে করা হচ্ছিল দেশের ফুটবলের ভবিষ্যতের তারকা। আশা ছিল, প্রতিভাবান সেই ফুটবলাররা দেশের ফুটবলের জন্য নতুন সূর্যোদয় এনে দেবে। দিয়েছিল ফুটবলের নতুন সূর্যোদয়ের। দুই বছর না পেরোতেই তারা হারিয়ে গেল। কে রাখবে তাদের খবর, কে করবে তাদের পরিচর্যা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন? এটা করতে বাফুফের বয়েই গেছে!
বাফুফে ভবনে আজ পরবর্তী সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের ডামাডোলের মধ্যে মিশে ছিল চাপা আক্ষেপ। নেপালে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী আসরের জন্য বাংলাদেশের নতুন একটি দল তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এই দলটির প্রতিভাবানদের ভবিষ্যৎ কী! বারবারই যে মনে পড়ে যায় ২০১৫ সালে সাফ জয়ী বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলের সাদউদ্দিন, সারোয়ার জামান নিপু, জুনায়েদ খান কিংবা ফয়সাল মাহমুদদের মুখগুলো। বাফুফে সে সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই প্রতিশ্রুতির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী চার বছর ধরে দলটিকে একসঙ্গে রেখে, সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণ দেওয়া কথা থাকলেও বাফুফের কর্তারা তা বেমালুম চেপেই গেছেন। নতুন গঠিত অনূর্ধ্ব-১৬ দলটির ক্ষেত্রেও যে একই ব্যাপার ঘটবে না জোর গলায় কিন্তু তা বলা যাচ্ছে না।
সাফ বিজয়ী সেই অনূর্ধ্ব-১৬ দলের প্রতিভাবানরা কেমন আছে? কোথায় আছে? সবাই যে একেবারে হারিয়ে গেছে, সেটি অবশ্য বলা যাবে না, দু-একজন ফুটবলকেই ভবিষ্যতের জীবন বানানোর জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। বিকেএসপির ছাত্রদের বাইরে মাত্র তিনজন খেলোয়াড়কেই খুঁজে পাওয়া যায় ফুটবলের আঙিনায় সাদউদ্দিন, আতিকুর রহমান ও সারোয়ার জামান নিপু। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো আছে সাদই। আবাহনীর প্রথম একাদশেরই খেলোয়াড় সে। তবে আবাহনীতেই বেঞ্চে বসে কাটছে আতিকের জীবন। শেখ জামালে সারোয়ার জামান নিপুর অবস্থাও খুব ভালো নয়। জুনায়েদ খান শাওন গত মৌসুমে ব্রাদার্সে খেললেও এবার তিনি খেলছেন না। ফোনে এই প্রতিবেদক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান।
অথচ এই নিপুই সাফে কী দুর্দান্ত ফুটবলই না খেলেছে। দ্রুতগতিসম্পন্ন, অসম্ভব প্রতিভাবান এই কিশোর ফুটবলারের খেলা দেখে মুগ্ধতা ঝরেছিল সবার দৃষ্টিতে। তার গোল করার সহজাত ক্ষমতা দেখে বাফুফের কর্তারাও বড় গলায় বলেছিলেন, নিপুর আবির্ভাবে নাকি স্ট্রাইকার সমস্যা কেটে গেছে বাংলাদেশের। অবস্থাপন্ন পরিবারের এই ছেলে কেবল ফুটবল নিয়ে থাকতে চায়। কিন্তু হতাশাচ্ছন্ন হয়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার কথাও ভেবেছিল সে। শেষ চেষ্টা হিসেবে শেখ জামালে নিজে থেকে যোগাযোগ করে আসাতেই রক্ষা। ফুটবলটা এখনো খেলতে পারছে সে, ‘আমার টাকার কোনো দরকার নেই। আমি বড় খেলোয়াড় হতে চাই। বাফুফে যদি অনুশীলনটা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিত! আমার ওটাই দরকার ছিল। কিন্তু বাফুফে সে দায়িত্বটা নিল না।’
সেদিক দিয়ে সাদ নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করে। হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপার ঘটেনি। আবাহনীতে সুযোগ মিলেছে। সেখানে যোগ্যতার প্রমাণও রেখে জায়গা করে নিয়েছ প্রথম একাদশে। পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। কিন্তু সাদের কষ্টটা ওর সতীর্থদের জন্যই, ‘দলটা একসঙ্গে রাখা উচিত ছিল। স্কোয়াডে প্রতিভার অভাব ছিল না। দলটাকে দুই বছর ধরে একসঙ্গে রেখে উন্নত প্রশিক্ষণ দিলে অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবলে আমরা খুব ভালো করতাম। অথচ দেখুন, কেউ আমাদের গাইডই করল না। কোনো সুযোগ পেল না অনেকেই। সেদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবান। আবাহনীর মতো দলে তো খেলতে পারছি!’
সাদউদ্দিন নিজের চেষ্টায় খেলছে আবাহনীতে। ছবি: প্রথম আলোবাফুফে কেবল এই ফুটবলারদের প্রতিভাকে অঙ্কুরেই শেষ করে দেয়নি, তাদের সঙ্গে প্রতারণাও করেছে। ২০১৫ সালে সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য গোটা দলের জন্য যে পাঁচ লাখ টাকার বোনাস ঘোষিত হয়েছিল, সাদ-নিপু-ফয়সালরা পায়নি সেখান থেকে একটি টাকাও।
সারা দুনিয়াতে জাতীয় দলের পেছনে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দল থাকে। সময়ের আবর্তে সেই বয়সভিত্তিক দলের ফুটবলাররাই জাতীয় দলে বড়দের শূন্যস্থান পূরণ করে। কিছুদিন আগে বাফুফে সভাপতি ‘আমার হাতে কোনো জাতীয় দল নেই’ বলে যে খেদোক্তি করেছিলেন, সেটিকে অনেকেই স্ববিরোধিতা বলছেন। কারণ, বাফুফেই ভবিষ্যতের তারকা তৈরির কোনো চেষ্টা চালায়নি। গত আট বছরে বেশ কয়েকটি বয়সভিত্তিক দলের ভিত্তি দাঁড়ালেও সেই প্রতিভাদের বিকাশে কোনো উদ্যোগই নেয়নি তারা। ২০১৫ সালে সাফ জয়ী অনূর্ধ্ব-১৬ দলটিকে একসঙ্গে রেখে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে এই দলটির খেলোয়াড়েরাই অভিজ্ঞ হয়ে উঠত। অনূর্ধ্ব-১৬-র পর অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-২৩ হয়ে একসময় দুর্দান্ত একটা জাতীয় দল হয়ে উঠত।
দুই বছর আগে সিলেটে বাংলাদেশের কাছে হেরে যাওয়া ভারতের অনূর্ধ্ব-১৬ দলটির পাঁচজন ফুটবলার আগামী অক্টোবরে ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে মাঠে নামবে। সেই প্রতিযোগিতার নেপালি দলটি নাকি নেপাল সেনাবাহিনীর জুনিয়র দল হিসেবে একসঙ্গেই রয়েছে। মালদ্বীপও এর ব্যতিক্রম নয়, কিন্তু ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশই। বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের অবহেলায় হারিয়ে যায় ফুটবল প্রতিভারা।
তবে ভবিষ্যতে বয়সভিত্তিক দলগুলো নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হবে বলে জানান বাফুফের কোচেস এডুকেশন সমন্বয়কারী জোবায়ের নিপু, ‘যেকোনো কারণেই হোক আমরা প্রতিভাবান ফুটবলারদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্যাম্প করতে পারিনি। তবে এখন থেকে এগুলো হবে। আমাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা বয়সভিত্তিক ফুটবল নিয়ে বেশ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে ভালো কিছুই হবে।’ হলেই ভালো। কিন্তু গত আট বছরের অভিজ্ঞতা যে খুব আশাবাদী হতে দেয় না।
- জাতীয় শোক দিবসে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি
- শোক সংবাদ-শাহ ইস্কন্দর মিয়া


