বিশেষ প্রতিনিধি
তিনি একজন পল্লী চিকিৎসক ছিলেন। নাম জালাল উদ্দিন। পিতার নাম আব্দুল আহাদ। বাড়ী সুনামগঞ্জ শহরতলির গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এলাকার তরুণদের উৎসাহিত করে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বালাটে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করতেন জালাল উদ্দিন। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য টেকেরঘাট সাবসেক্টর থেকে ওষুধ আনতে গিয়ে রাজাকারদের হাতে ধৃত হয়ে মৃত্যু হয় তার। পরবর্তীকালে এই পল্লী চিকিৎসকের লাশ খুঁজে পায়নি তাঁর পরিবার। মৃত্যুর সময় ৪ বছরের কন্যা মনোয়ারা বেগম এবং ২ বছরের ছেলে শমসুন নূর এবং স্ত্রী সালেহা বেগমকে রেখে যান তিনি। এরপর স্ত্রী সালেহাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয় শ্বশুর বাড়ীর লোকজন। কিছুদিন পর জালাল উদ্দিনের শিশু পুত্র শমসুন নূরের ৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। কষ্টে-সৃষ্টে একমাত্র কন্যা মনোয়ারা বড় হয়ে বিয়ের উপযুক্ত হলে চাচা বারিক মিয়া দিনমজুর হাসান আলীর কাছে বিয়ে দেন মনোয়ারা বেগমকে। মনোয়ারা বললেন,‘বাবার চেহারা ভুলে গেছি আমি। শুধু এটুকু মনে হয় আমার বাবা আমাদের ভাই বোনকে একসঙ্গে কোলে নিয়ে যুদ্ধের সময় বলতেন, ‘জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু, আর কোন কিছুই মনে পড়ে না’।
মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র, সুনামগঞ্জ’ এর আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’ লেখা রক্তাক্ত ৭১’এ সাধারণ শহীদের তালিকায় জালাল উদ্দিনের নাম থাকায় শনিবার লালপুরে সরেজমিনে জালাল উদ্দিনের বাড়ীতে গেলে কথা হয় মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে।
৪৯ বছর বয়সী মনোয়ারা জানালেন, স্বজন হারানোর বেদনা মুক্তিযুদ্ধের পর তিলে তিলে গিলেছে তাকে। বাবা-মা ভাই সবই ছিল তাঁর। বাবাকে হায়েনারা হত্যা করার পর সবই শেষ হয়ে গেছে মনোয়ারার।
মনোয়ারা জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা জালাল উদ্দিন টেকেরঘাটে গিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ আনতে। এরপর আর ফিরেননি। চাচা বারিক মিয়া খুঁজাখুঁজি করে পাননি তার বাবাকে। পরে লোকজন এসে বলেছে তাঁর বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করতো, এজন্য তাকে রাজাকাররা টেকেরঘাট থেকে আসার সময় আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে মেরেছে। এই খবর পেয়ে মায়ের কান্না দেখে তারা দুই ভাই-বোনও কেঁদেছিলেন, এটুকু মনে আছে মনোয়ারার।
মনোয়ারা জানালেন, বাবার মৃত্যুর পর ৪৫ বছর ধরেই সংগ্রাম করে জীবন কেটেছে তাঁর। নানা-নানী এসে মা’কে নিয়ে অন্যত্র বিয়ে দিলেন। ছোট ভাইটি ৮ বছর বয়সে মারা গেল। বাবার অনেক জমি-জমা থাকলেও চাচার সংসারে অনাদরে-অবহেলায় বড় হয়েছেন তিনি। একসময় দরিদ্র দিনমজুর হাসান
আলীর কাছে চাচাই বিয়ে দেন তাঁকে। হাসান আলীও সংগ্রামী মানুষ।
সহজ সরল হাসান আলী ও মনোয়ারার (দুই জনের) পরিশ্রমেই গত ৪৫ বছরে তাদের সংসার গড়ে ওঠেছে। হাসান আলী এখনও বিভিন্ন বাড়ী থেকে গরুর দুধ সংগ্রহ করে শহরে এনে বিক্রি করেন। মনোয়ারা বাড়ীর আশপাশে সবজী চাষ করে বিক্রি করেন।
এখন তাদের ৬ সন্তান। বড় ছেলে আনছার আলী বেসরকারি চাকুরির পাশাপাশি সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ইলেকট্রো মেডিকেলে ডিপ্লোমা সমাপন করে ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বিএসসিতে ভর্তি হয়ে ইলেকট্রিকেল-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা করছে। দ্বিতীয় ছেলে শান্ত মিয়া এবং তৃতীয় ছেলে তুহিন মিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করছে। বড় মেয়ে শারমিন বেগমকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়ে বৃষ্টি এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। তৃতীয় মেয়ে সুইটি বেগম ৮ম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে।
মনোয়ারা জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর বাবার নামটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ওঠানোর চেষ্টা করেনি কেউ।
সম্প্রতি তাঁর ছেলে আনছার আলী তাদের ইউনিয়নেরই মুক্তিযোদ্ধা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়েছিল, তিনি তাকে দেখে বলেছেন, জালাল উদ্দিনের কোন সন্তান আছে বলেই তো জানতেন না তারা। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্তির আবেদনের সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি তাকে ঢাকায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
মনোয়ারা বললেন,‘বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অনেক দয়ালু, অনেক মানুষকে দয়া করছেন তিনি। দয়া করে তিনি (শেখ হাসিনা) আমার বাবার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে দিলে আমার মনের কষ্ট কমবে, আমার সন্তানেরা উপকৃত হবে’।
মনোয়ারার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী বৃষ্টি বেগম বলেন,‘আমার নানা মক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি পেতাম। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, আমাদের বিশ্বাস এই সরকার আমার নানার অবদানের স্বীকৃতি দেবে’।
সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান বলেন,‘জালাল উদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই যুব-তরুণদের উৎসাহিত করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিসংগ্রাম স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক মরহুম দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী’র সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। তিনি পল্লী চিকিৎসক ছিলেন। টেকেরঘাট সাব সেক্টর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য ওষুধ আনতে গিয়ে তাহিরপুরের শনির হাওরে জালাল উদ্দিনসহ ৩ জনকে বহনকারী নৌকা রাজাকারদের কাছে আটকা পড়ে। ঐ রাজাকারের নৌকায় এক পাকিস্তানী মিলেশিয়াও ছিল। এরপর আর জালাল উদ্দিনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় জালাল উদ্দিনকে এরা মেরে লাশ গুম করেছিল’।


