বাড়ছে পানি, বাড়ছে দুর্ভোগ- জামালগঞ্জে বানভাসা মানুষের সাহায্য আর্তি

বিশ্বজিত রায়, জামালগঞ্জ
আরেক দফা বন্যার কবলে পড়েছে জামালগঞ্জের মানুষ। আগের পানি শুকাতে না শুকাতেই ফের পানিতে ভাসছে উপজেলাবাসী। রাস্তাঘাট তলিয়ে অধিকাংশ বাড়ি-ঘর থইথই করছে পানিতে। এতে রাস্তাঘাটসহ বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গেল ক’দিন আগের বানে ভাসা দুর্ভোগ এখনও কেউ কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তারপর আবার দেখা দিয়েছে উপর্যুপরী বন্যা।
এ অবস্থায় মারাত্বক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। খেটে খাওয়া নি¤œ আয়ের মানুষেরা চরম দুর্যোগকাল অতিক্রম করছে। একদিকে নিজেদের ভোগান্তি অন্যদিকে গরু-বাছুর, ভেড়া-ছাগল, হাঁস-মুরগী ও পুকুরের মাছসহ নানা সমস্যায় পতিত হয়েছে উপজেলার অধিকাংশ লোকজন। দুর্যোগ কবলিত এসব মানুষ ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে বসে আছে। অপরিচিত কেউ খোঁজ খবর নিতে গেলে একটু সাহায্যের আর্তি জানাতে এগিয়ে আসছে বানভাসী মানুষ।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সুরমার সুনামগঞ্জ সদর পয়েন্টে বন্যার পানি বিপদসীমার ৫১ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির স্বাভাবিক গতি ৭.৮০ মিটার উৎড়িয়ে সুরমার পানি প্রবাহ বর্তমানে ৮.৩১ মিটার পর্যন্ত ডিঙিয়েছে। পানি আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বন্যা কবলিত চাঁনপুর ও সোনাপুর ঘুরে দেখা যায়, পুরো গ্রাম দুটোই পানিতে নিমজ্জিত। গ্রামের রাস্তাঘাটে ঢেউ খেলছে কোমরসম পানি। অনেক বাড়ির বসতভিটেসহ প্রায় পুরোটাই তলিয়ে গেছে। কেউ জাল দিয়ে ভেসে যাওয়া পুকুর সামলানোর চেষ্টা করছে। অনেকের গরু-বাছুর পানিতে তলানো খড়ের গাদার সামনে দাঁড়িয়ে খাবার খেতে দেখা গেছে। পানিবন্দী অসহায় অনেকে কোনরকম জেগে থাকা গ্রাম্য দোকানে বসে অভিশপ্ত সময় পার করছে। পরিচয় জেনে তারা এই প্রতিবেদকের কাছে নিজেদের বন্যাক্রান্ত কষ্টের কথা তুলে ধরে সাহায্য সহযোগিতার আবদার জানিয়েছে।
অন্যদিকে পাগনা হাওর পারস্থ চাঁনপুর (আবুর হাঁটি) গ্রামের মো. বজলুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা পানিতে ভাসছে তার বসতভিটে ও হাঁসের খামারটি। লোকালয় থেকে খানিক দূরে দ্বীপের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। ঘর ও খামারে পানি ঢুকে মারাত্বক ক্ষতি ও ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে পুরো পরিবারটিকে। চলতি বন্যায় এ রকম ঝুঁকি ও ক্ষতির সম্মুখীন উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে তারা এখন সরকার ও বিত্তবানদের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাকে এখন জরুরী ভিত্তিতে বানভাসী মানুষের পাশে দাঁড়ানো জরুরী বলে মনে করছেন উপজেলার সচেতন মহল।
খামারী বজলুর রহমান বলেন, ‘পানি বাড়ার সাথে সাথে চিন্তাও বাড়তে থাকে। বন্যায় একদিক থাইক্যা নিজে বাঁচন অন্যদিকে খামার নিয়া ঠিইক্যা থাকন, দুইটাই ঝুঁকি। এই দিনে ক্ষতির মুখে তো আছিই, আছি জীবন লইয়া টানাটানির মধ্যেও। কেমনে বাঁচমু এইডাই অখন বড় কথা।’
বন্যায় বিপর্যস্ত সোনাপুর গ্রামের সত্যরঞ্জন দত্ত বলেন, ‘সব তলাইয়া গেছে। দাঁড়ানোর মতো জাগা নাই। আমরা অখন স্কুল ও উঁচু বাড়িতে আশ্রয় নিয়া খাইয়া না খাইয়া কোনরকম দিন পার করতাছি। আমরা সাহায্য চাই। কেউ যদি সাহায্যের লাগি আগাইয়া না আয় তা হইলে পানি আমরার খাইয়াই মরণ লাগব।’
চাঁনপুর গ্রামের গন্ধরাজ কর জানিয়েছেন, ‘চারদিক দিয়া শুধু পানি আর পানি। কই গিয়া দাঁড়াইমু, কার কাছে যাইমু। অখলেই পানিতে খাড়াইয়া আছে। না খাইয়া মানুষ তো মরব মরবই, তার সাথে গরু-বাছুরডিও ভাইস্যা যাইব। আপনারা একটু সাহায্য করইন আমরারে।’
বেহেলী ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের ঝুনু রায় বলেন, ‘বাড়িত পানি উইঠ্যা গেছে। গরু-বাছুর খেরকুডা লইয়া এখন স্কুল বাড়িত উঠতো হইব। এছাড়া কোন গতি নাই।’
আছানপুর গ্রামের মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘কয়দিন আগে যে পানি হয়েছিল বর্তমানে তার চেয়েও বেশি। ঘর থেকে বের হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সবার বাড়িতে বাড়িতে পানি। মানুষ খুব বিপদকাল অতিক্রম করছে।’
প্রাক্তন ইউপি সদস্য ও উপজেলা খেলাঘর আসরের সভাপতি আলী আক্কাছ মুরাদ বলেন, ‘প্রথম বন্যার পানি দ্রুত চলে গেলেও এখনকার পানিটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। মানুষের ভোগান্তিও চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছবে। পানিবাহিত রোগশোকসহ খেয়ে না খেয়ে মারাত্বক দুর্দশায় পতিত হবে মানুষ। তাই সকল জনপ্রতিনিধি ও সরকারি সংস্থাকে দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’
বানভাসীদের প্রতি সতর্ক ও সাবধানতার আহবান জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব বলেন, ‘বন্যা কবলিতদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে সকল স্কুল খুলে দেওয়া হয়েছে। সকল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের বলে দেওয়া হয়েছে তারা যেন বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। পাশাপাশি নৌকার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বানভাসীদের মাঝে শুকনা খাবার পৌঁছে দিতে আমি এখন নৌকায় আছি। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে।’