মধ্যনগর প্রতিনিধি
এখনো পানি আসেনি হাওরে। মৌসুমি বৃষ্টিতে হাওরের নিচু ধান ক্ষেতগুলো টুইটুম্বুর। আর এতেই কাটা ধান গাছগুলো হয়েছে সতেজ ও সজীব। ইতোপূর্বে কেটে নেয়া সেই ধানগাছের গোড়ায় আবারও বেড়িয়েছে সোনালী রংয়ের চকচকে ধানের শীষ। একই গাছে দ্বিতীয় দফায় উৎপাদিত এই ধান স্থানীয়দের কাছে ‘ডেমিধান’ নামে পরিচিত।
চলতি বছর হাওরাঞ্চলে বোরোধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধানের পাশাপাশি গো-খাদ্য হিসেবে বিপুল পরিমাণ খড় সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন ডেমিধানের ফলন হাওর কৃষিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।
কৃষকেরা জানান, হাওরের নিচু জমিতে আগাম জাতের ধান চাষ করা হয়। মৌসুমী বৃষ্টিপাতের ফলে এসব জমির কাটা ধানগাছের গোড়ায় ১৮/২০ দিন পর আবারও ধানের শীষ বেরোয়। ২৫/৩০ দিনের মধ্যে সেই ধান কাটা যায়। ফলন কম হলেও এ ধানে কোনো চিটা থাকে না। আকারে পূর্বের চেয়ে কিছুটা ছোট ধানের চালের ভাত খেতে অনেক সুস্বাদু হয়। মধ্যনগর উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সবখানেই কমবেশি ডেমিধান কাটা চলছে। সাধারণত স্বচ্ছল বা ধনী কৃষকেরা এ বছরে বোরো ধানের বাম্পার ফলনে মহাআনন্দিত। ক্ষেতের ডেমিধান নিয়ে তাদের তেমন আগ্রহ নেই। ধনী কৃষকদের বলে কয়ে আশপাশের ভূমিহীন কৃষি শ্রমিকেরা তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরে তুলছেন এই ডেমিধান। পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরাও নিজেদের জমির ডেমিধান কাটছেন।
উপজেলার বানচাপড়া হাওরের পূর্বপাশের জমিতে ডেমিধান কাটছিলেন কৃষক দেবকুমার তালুকদার। হাঁটু পানিতে নেমে একাকী একমনে ডেমিধানের গোছায় কাঁচি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। মধ্যদুপুরের তীব্র রোদে গা বেয়ে ঝরছে ঘাম। তিনি বললেন, এই জমির মালিক পার্শ্ববর্তী পলমাটি গ্রামের স্বচ্ছল কৃষক মৃত. লাল হোসেনের ফকিরের পরিবার। জমির মালিকের অনুমতি নিয়েই তিনি ডেমিধান কাটছেন। এ পর্যন্ত প্রায় কিয়ার (৩২ শতক) খানেক জমির ধান কেটেছেন, পেয়েছেন সাড়ে ৩ থেকে ৪ মন ধান।
দেখা গেল হাওর জুড়ে তার মতো আরও অনেকেই নিজের বা কোনো ধনী কৃষকের অনুমতি নিয়ে জমির ডেমিধান কাটছেন। এ যেন ধানকাটার ছোটখাটো অনাড়ম্বর আরেকটি উৎসব।
রংচী গ্রামের কৃষক সাইকুল ইসলাম জানালেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ৫ কিয়ার জমির ডেমিধান কেটেছেন তিনি। কিয়ার প্রতি প্রায় ৩ মন ধান পেয়েছেন। তার মতো ওই গ্রামের আরও ৭০/৮০ জন দরিদ্র কৃষক ও ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক ডেমিধান কেটেছেন।
সদর ইউনিয়নের বোয়ালার হাওরের কৃষক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিতোষ সরকার বলেন, হাওরাঞ্চলে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য এ সময়ে সাধারণত কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা থাকে না। আগে গ্রামের শ্রমজীবী মানুষেরা কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাড়ি জমাতো। এ বছর হাওরে দেরীতে পানি আসায় এসব মানুষ এই ডেমিধান কাটছে। এতে আর্থিক ভাবে লাভবান হবার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সাথে থাকতে পারায় তাদের মাঝে আনন্দ বিরাজ করছে।
মধ্যনগর উপজেলার অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে থাকা ধর্মপাশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মীর হাসান আল বান্না বলেন, হাওরে এখনো পানি না আসায় আগাম জাতের ধান ক্ষেতগুলোতে দ্বিতীয় দফার ফলনে কৃষক লাভবান হচ্ছেন। এই ফলনের জন্য কৃষকের অর্থ বা শ্রম কোনটাই বিনিয়োগ করতে হয়নি। তাই একে কৃষকের বোনাস হিসাবে অভিহিত করা যায়।
তিনি আরও জানান, মধ্যনগর উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ডেমিধানের ফলন হয়েছে। হেক্টর প্রতি ১ মেট্রিক টন হিসেবে এ থেকে প্রায় দেড় হাজার মেট্রিক টন ধান কৃষকের ঘরে উঠবে বলে আশা করা যায়। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।


