বাড়ির কাছে আরশি নগর

কুমার সৌরভ
রবিতীর্থ শিলাইদহে
কুষ্টিয়া আসার মূল উদ্দেশ্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ও লালন শাহ’র মাজার দেখা। কুষ্টিয়া পা রাখার পর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমার যাবতীয় নিয়ন্ত্রণভার নিজে নিজেই গ্রহণ করে ফেলেছেন বন্ধু-ভগ্নিপতি দিলীপ কুমার বাগচি। তিনি আগের রাতেই কর্মসূচী ঠিক করে রেখেছিলেন, পর দিন সকাল নয় টার মধ্যে আমরা শিলাইদহ অভিমুখে রওয়ানা হব। এই ভ্রমণে আমাদের সাথী হবেন আরেক সহকর্মী আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি শৌখিন কিন্তু সিরিয়াস টাইপের পরিব্রাজক। দলবদ্ধ ঘুরাঘুরির পরিবর্তে একা একা দর্শনীয় স্থানে যাওয়াটাই তার পছন্দ বেশি। তার মতে, এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার খুঁটিনাটি তথ্য জানাসহ পুরো এলাকা ও স্থাপনা ভালভাবে দেখা যায়। মনে কোন তাড়া থাকে নাÑ এই বুঝি অন্যদের ফেরার সময় হলো। তিনি বলছিলেন, সৌন্দর্যে মগ্ন হতে একাকিত্ব হলো একেবারেই জরুরি।  তিনি শৌখিন মানুষ, ঘুরাঘুরিতে ব্যয় করার মতো অর্থ ও সময় দুই-ই আছে, সবচাইতে বেশি আছে মনের টান। আমরা হলাম গিয়ে তার তুলনায় নস্যি। পয়সা খরচ করে কোথাও গিয়ে কিছু দেখাকে ¯্রফে টাকার শ্রাদ্ধ মনে করি। আমরা মুফতে ভ্রমণের আনন্দ লাভের মওকা নেওয়ার লোক। এখন যেমন ভগ্নিপতির ঘারে সওয়ার হয়েছি সিন্দবাদের ভুত হয়ে, আর হাড়-মাংস জ্বালাচ্ছি আদরের ছোট বোনটির, এমন আর কি।  
আনোয়ার ভাই সকাল সাড়ে আটটার ভিতরেই দিলীপ বাবুর বাসায় এসে হাজির নিজের মোটর বাইক চালিয়ে। তিন বন্ধু মিলে বোনের হাতে তৈরি লুচি, সবজি ও পায়েস সহযোগে চমৎকার প্রাতঃরাশ হয়ে গেল। ধুমায়িত গরম চা খেতে খেতে আনোয়ার ভাই জানালেন গতবছর শীতে তিনি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট হয়ে নেত্রকোনার গারো এলাকা ঘুরে এসেছেন একা একা। তার দেয়া যে তথ্যটি শুনে আমার ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হলো সেটি হলো তিনি নাকি কুষ্টিয়া থেকে সুদূর সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা অঞ্চলের ভ্রমণটি সেরেছিলেন নিজের মোটর বাইকে করে। এ কথা শুনে ভালভাবে আনোয়ার ভাইকে নিরীক্ষণ করলাম। মুখে হ্রস্ব দাড়ি। চেহাড়ায় বয়সের ছাপ এসে গেছে অনেকটা। চোখ দুটো অসম্ভব তীক্ষè ও উজ্জ্বল। এই বয়সে এত দূরের জার্নি মোটর সাইকেল চালিয়ে করে আসার কথা শুনে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মাত্রাটা বেড়ে গেল। দিলীপ বাবুও বলছিলেন, আমাদের আনোয়ার ভাই এরকমই, একটু খ্যাপাটে টাইপের। মর্জি হলেই নিজে নিজে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। এমন সহযাত্রীর সাথে ঘুরাঘুরি ভাগ্যের ব্যাপার বটে।
নয়টার ভিতরেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। আনোয়ার ভাইর ১০০ সিসি মোটর সাইকেলে তার পিছনে আমরা দুই বিশালদেহী চেপে বসলাম। তিনি মোটর সাইকেলে স্টার্ট দিলেন। কুষ্টিয়ার সড়ক ধরে মোটর সাইকেলটি আস্তে ধীরে চলতে শুরু করল। কেমন জানি মনে হলো বাহনটি আমাদের তিনজনের ভার বইতে পারছিল না। মাঝে মধ্যেই ইমব্যালেন্স হয়ে যাচ্ছিল যানটি। মোটর সাইকেলটি চৌড়হাঁস মোড়ে আসতেই আমি বললাম,আনোয়ার ভাইÑ থামেন। মোটর সাইকেল থেমে গেল। আমি নামলাম। বললাম, মোটর সাইকেলটি কোথাও রেখে দিন। আমরা অন্যভাবে শিলাইদহ যাব। এই একজনের পিছনে আরেকজন চেপে বসে যাতায়াত করাটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। কেউ কারও সাথে কথা বলতে পারছি না, মুখ দেখতে পারছি না। দিলীপ বাবুও আমার কথায় সায় দিলেন। অগত্যা আনোয়ার ভাই তার প্রিয় দুই চাকার বাহনটি মোড়েই এক দোকানে চেনা বন্ধুর হাওলায় রেখে আমাদের মতের সাথে ঐকমত্য ঘোষণা করলেন। ততক্ষণে দিলীপ বাবু একটি ইজিবাইক থামিয়েছেন। আমরা উঠে পড়লাম। আপাতত গন্তব্য গড়াই নদীর পাড়। গড়াই পার হয়ে শিলাইদহ যেতে হয়। গড়াই নদী মূলত পদ্মার একটি শাখা নদী। দিলীপ বাবু বলছিলেন,  কুষ্টিয়া শহর থেকে ১৮/২০ কিলোমিটার দূরে তালবাড়িয়া গ্রামের কাছে পদ্মা নদী থেকে আলাদা একটি শাখা বের হয়ে গড়াই নাম ধরে এই নদীটি প্রবহমান হয়েছে। এটি মধুমতি নদীতে গিয়ে মিশেছে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নদীকে ডাকতেন গৌরী নামে। ভাগ্যবান নদী বটে এই গড়াই। স্বয়ং রবীন্দ্রপ্রেমে ধন্য হয়েছিল সে। রবীন্দ্র আমলে এই গড়াই ছিল প্রমত্তা যৌবনে টলটল লাবন্য প্রভায় সমুজ্জ্বল, অন্তত বর্ষায় তো বটেই। এই যৌবনবতীর প্রেমে পড়েছিলেন কবি। মুগ্ধ কবি লিখেছিলেন, ‘নতুন ধানের আঁচল জড়ায়ে ভাসিছে জলের পর/ একখানা যেন সবুজ স্বপন একখানা যেন মেঘ/  আকাশ হইতে ধরায় নামিয়া ভুলিয়াছে গতিবেগ/ দুপুরের রোদে আগুন জ্বালিয়া খেলায় নদীর চর/ দমকা বাতাসে বালুর ধু¤্র উড়িছে নিরন্তর/ জোনাকী মেয়েরা স্বপনের দীপ দোলায় বুকের পর।’ তবে বোধ করি গৌড়ির চোহারায় বয়সের ছাপ পড়ে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সময়েই। কারণ তিনি যখন লিখেন, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে/ পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি/দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি’ তখন আমরা মনে করতে পারি রবীন্দ্রনাথ বোধ হয় প্রিয়তমা গৌরীর বয়সকালীন রূপবন্দনাই করছেন । এখন কবিও নেই আর কবি বিহনে নদীটিও যৌবন হারিয়ে অতি বৃদ্ধাবস্থার হতশ্রী চেহারা নিয়ে কোন মতে জীবন প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। আমরা ডিসেম্বরের শীতে এই ভ্রমণ করছিলাম। শীতের শুষ্ক ও রুক্ষতায় নদীর বুকে হাহাকারের মরুচর তৈরি করেছে। বিশাল সে চর। অন্তত ৩০০ গজ (আনুমানিক) চর পেরিয়ে তবে নদীর শীর্ণ জলরেখা যেখানে যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ ফেরি নৌকা। নদীর অগভীর জলরাশি চরের পলি মিশে ঘোলা হয়ে আছে। এ নদী কোনভাবেই রবীঠাকুরের গৌরী নয়। এ হলো একালের গড়াই, আরও বিখ্যাত সব নদীর মতোই মৃতবৎ, নদী-মেখলা গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের বড় বড় অশ্রুবিন্দু।
নদী পার হয়ে ওপারে পৌছে আবারও চর। চরেই দাঁড়িয়ে অনেক সিএনজি, ইজিবাইক আর টমটম। সমস্বরে হাঁকডাক। শিলাইদহ যাবেন..কাছারীবাড়ি  যাবেন.. । আমরা ইচ্ছে করেই টমটম নিলাম দুপাশের দৃশ্যাবলী নয়নভরে উপভোগ করে করে যাওয়ার জন্য। আমার মনে অন্য ধরনের এক অনুভূতি কাজ করছিল। এই এলাকায় হেঁটে বেড়িয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। এই গড়াইনদী দিয়ে তিনি বোটে করে এসেছেন কতবার। এই নদীতে নিজের পছন্দের নৌকায় বসে চন্দ্রালী রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। আঁধারের তন্ময় রূপে মোহিত হয়েছিলেন। লিখেছেন গল্প কবিতা গান। বাঙালি জাতিসত্ত্বার সাংস্কৃতিক বিকাশের জায়গায় রবীন্দ্রনাথ এক উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক। তার মত করে এই অনার্য অপাঙক্তেয় বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি আর কেউ। প্রতিটি বাঙালি রবীন্দ্রনাথ দ্বারা কোন না কোনভাবে প্রভাবিত। জীবনের এমন কোন বাঁক নেই যেখানে রবি কবির সহায়তা নেওয়া যায় না। দুঃখে তিনি আনন্দে তিনি। দ্রোহে তিনি কাতরতায় তিনি। প্রেমে তিনি বিরহেও তিনি। পরাজয়ে তিনি বিজয়েও তিনিই। রাগে-বিরাগে তিনি মিলনেও তিনি। এই যে সর্বব্যাপী রবীন্দ্রপ্লাবন তা আর কোন্ বাঙালির দ্বারা সম্ভব হয়েছিল? এমন এক মহাপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় নিজেকে আবিষ্কার করে রোমাঞ্চে আনন্দে মনময়ুর বার বার পেখম মেলে দিচ্ছিল উন্মুক্ত আকাশের মিঠেকড়া রোদ্দুরে। এসময় মনে হলো তারুণ্যে আমরা রবীন্দ্র বর্জনের নামে এক ধরনের অগভীর কাজে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ জমিদার তাই তিনি ইংরেজদের বশং-বদ। তিনি শোষক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি তাই তিনি পরিত্যাজ্য। তার রচনায় বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ নেই রয়েছে আত্মসমর্পনের পরাজয়, তাই তিনি অস্পৃশ্য। এমন ধরনের  একপ্রকার অতিবিপ্লবীপনা তৎপরতায় আক্রান্ত ছিল আমাদের যৌবনের একটা সময়। ওই সময়ের কিছুটা ছোঁয়া লেগেছিল আমার গায়েও। পরে অবশ্য এই বিতর্কের অবসান ঘটেছিল। রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভিতরে লোকানো আগুনের তেজ ঠিকই সকলের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করেছিল। সুরমা পাড়ের গাঙচিল বাংলা গণসঙ্গীতের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি হেমাঙ্গ বিশ্বাস তার ‘রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিচার, বিশ্লেষণ ও ব্যবহার’ প্রবন্ধে লিখলেন, ‘ আমরা গণনাট্যের কর্মীরা দেশের জনগণের সঙ্গে যতটা বেশি মেলামেশা করেছি যতটা বেশি সংযোগ রেখেছি গণসংস্কৃতির সঙ্গে- রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই তার চাইতে কম ছাড়া বেশি করেননি। রবীন্দ্রনাথ জনগণের সঙ্গে মিশেছেন জমিদারের ছেলে হিসাবে তাও শিলাইদহ পাবনা শাহাজাদপুর কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে। অথচ দেখুন কি আশ্চর্য ফসল ফলিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের এই ইতিবাচক দিকটি যদি আমরা স্বীকার না করি তাহলে আলোচনা সঠিক হবে না।’ রবীন্দ্রকাব্যে যখন এমন পঙক্তির দেখা মিলেÑ‘খোলো খোলো দ্বার ওগো গৃহস্থ,/ থেকো না থেকো না লুকায়ে-/  যার যাহা আছে আনো বহি আনো/সব দিতে হবে চুকায়ে।/ঘুমায়ো না আর কেহ রে।/ হৃদয়পি- ছিন্ন করিয়া/ ভা- ভরিয়া দেহো রে।/ ওরে দীণপ্রাণ, কী মোহের লাগি/ রেখেছিস মিছে ¯েœহ রে। উদয়ের  পথে শুনি কার বাণী,/ ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ (সুপ্রভাত)।   তখন কি বলার অপেক্ষা রাখে বিদ্রোহ আর কতটা সুতীব্র হতে পারে? মূলত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সকল কিছুকে ধারণ করে মহামানবমিলনতীর্থ তৈরির জন্য ব্যাকুলঅন্ত প্রাণ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক মহাভারতবর্ষ যেখানে-‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান-/এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খৃস্টান।/ এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন ধরো হাত সবাকার।/ এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার।’ (ভারত তীর্থ)। এমন মহামিলনের মহাপ্রাণ বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় আসলে বাঙালি মাত্রই শিহরিত হবে, যেমন এখন আমিও হচ্ছি। (চলবে)