স্টাফ রিপোর্টার
পাকা ভবনটি সাজানো-গোছানো। ভিতর-বাইরে রং করা। রয়েছে বিদ্যুৎ, স্যোলার প্যানেল, নিরাপদ পানির জন্য গভীর নলকূপ। নারী-পুরুষের পৃথক টয়লেট। টাইস বসানো পরিচ্ছন্ন প্রসব কক্ষ। অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীদের জন্য আলাদ বসার ব্যবস্থা। ভবনে সহজে যাতায়াতে জন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য র্যাম্প। অথচ তিন বছর আগে এই ভবনের পরিবেশ ছিল ভিন্ন।
সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত তাহিরপুর উপজেলার বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকের চিত্র এটি। শুধু বালিয়াঘাট নয়, উপজেলার ১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের এমন পরিবেশ তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি ভূমিকা রেখেছেন স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও একটি বেসরকারি সংস্থা। যে কারণে এসব ক্লিনিকে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি নারীদের নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসব বাড়ছে। বাড়ি কাছেই মানুষ পাচ্ছেন প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা।
তখন ভরাবর্ষা। সুবর্ণা বেগম (২২) যখন প্রসব ব্যথায় কাতর, তখন রাত। কি করবেন ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না তাঁর বাবা আবদুল মৌলা (৬০)। নৌকা রিজার্ভ করে মেয়েকে নিয়ে হাওর পাড়ি দিয়ে যেতে হবে উপজেলা সদরে। হাতে টাকা নেই, মিলছিলনা নৌকাও। কোনো উপায় যখন হচ্ছিল না, তখন এক প্রতিবেশী বলেন পাশের গ্রামে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যেতে। পরে দ্রুত সেখানে নেওয়ার পর প্রশিক্ষিত ধাত্রীর হাতে সুবর্ণা এক ছেলেসন্তানের জন্ম দেন।
বলছিলেন সুর্বণা বেগমের বাবা আবদুল মৌলা (৬০)। তাঁর বাড়ি তাহিরপুর
উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের মাটিয়ান হাওরপাড়ের গোলকপুর গ্রামে। এলাকার বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকে তার মেয়ে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সন্তান জন্ম দেন।
উপজেলা স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহিরপুরে বর্তমানে ১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু আছে। সবকটিতেই অন্যান্য সেবার পাশাপাশি নারীদের গর্ভকালীন নানা সেবা, পরামর্শ এবং স্বাভাবিক প্রসব হয়। এসব ক্লিনিক চালুর পর এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশনের ব্যবস্থা ছিলনা। পরিবেশও ছিল অপরিচ্ছন্ন। এখন সব বদলেছে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে এপ্রিল থেকে এই উপজেলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এফ্যারটস ফর রুরাল এডভান্সমেন্ট (ইরা) ওয়াটারএইড বাংলাদেশের সগযোগিতায় উপজেলায় ‘ওয়াস ইন হেলথ’ নামের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমেই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় থাকা স্থানীয় লোকদের নিয়ে গঠিত কমিউনিটি গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করা হয়। প্রতিটি ক্লিনিকে রয়েছে একটি করে দানবাক্স। সেবাপ্রার্থীরা তাদের সামর্থ অনুযায়ী তাতে দান করেন। অংশীদারি তহবিল এবং দান থেকে পাওয়া টাকা দিয়েই ক্লিনিকের প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ ছোটখাটো কাজ করা হয়।
বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) বিলাল হোসাইন জানান, ১৪টি গ্রামের মানুষ তার এখানে সেবা নিতে আসেন। এখানে ২৭ ধরনের সেবা দেওয়া ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। নারীদের প্রসবের কাজটি করেন একজন কমিউনিটি স্কিল ভার্থ অ্যাটেন্ডেন্ট (সিএসবিএ)। সিএসবিএ বিনা বেতনে কাজ করেন। যদি প্রসবের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা দেখা দেয় তখন ওই নারীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। তাঁর ক্লিনিকে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার মানুষ সেবা নেন। এর মধ্যে নারী-শিশুই বেশি। গত তিন বছরে তাঁর এখানে ৫২জন নারীর নিরাপদ প্রসব হয়েছে। পুরানখালাস কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইসসিপি মো. জহিরুল ইসলাম জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তার এখানে চারজন নারী স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন। এ ছাড়া গত জানুয়ারি মাসে এক হাজার ২৮জন, ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ৩৮২জন নারী, পুরুষ ও শিশু এখানে সেবা নিয়েছেন।
উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খসরুল আলম জানান, তাঁর ইউনিয়নে চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। এক সময় এগুলো পরিত্যক্ত ছিল। এখন প্রতিটি ক্লিনিক চালু আছে। তিনি দুটির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের সরবরাহ কম। এটি বাড়ানো দরকার।’
ইরার ‘ওয়াস ইন হেলথ’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক দেবেশ চন্দ্র তালুকদার বলেন, তৃণমুল পর্যায়ে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থসেবা পৌঁঁছে দিতেই কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সেবার মান বাড়ানো ও প্রতিষ্ঠান কার্যকর রাখতে হলে জনসম্পৃক্ততা দরকার। তাহিরপুরের ১৮টি ক্লিনিকের অংশীদারি তহবিল রয়েছে। এসব তহবিলে এখন জমা আছে পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ২৫০টাকা। ক্লিনিকগুলো সংস্কারের আগে গড়ে প্রতিদিন ৩৬জন সেবা প্রার্থী আসতেন। এখন সেটা বেড়ে ৫১জন হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুমন চন্দ্র বর্মণ জানান, এটি হাওর এলাকা, যোগাযোগ একটি বড় সমস্যা। তাই প্রতন্ত অঞ্চলে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অন্যান্য সেবা পাশাপাশি নারীদের স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি। এখন উপজেলার প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকই বেশ ভালো অবস্থায় চলছে। অবশ্য এ জন্য সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।


