বিকল ভর্তুকির ৫০ হারভেস্টার

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ৫০ টি হারভেস্টার মেশিন বিকল পড়ে আছে। নষ্ট হওয়া মেশিনগুলো সচল না হবার জন্য কৃষকরা দোষছেন বিক্রেতা কোম্পানীকে, বিক্রেতারা দোষছেন কৃষকদের। অথচ. এসব মেশিনে সরকারের লাখ লাখ (মোট মূল্যের ৭০ ভাগ টাকা) টাকা ভর্তুকি দেওয়া রয়েছে।
এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে শুরু হবে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা মাড়াই। গেল কয়েক বছর হয় বোরো মৌসুমে ধান কাটা শ্রমিকের অভাব ছিল হাওরজুড়ে। শ্রমিকের সংকট দূর করার জন্য ২০০৯ সাল থেকে সরকার ভর্তুকি মূল্যে হারভেস্টার মেশিন দিচ্ছে। প্রথমে ভর্তুকি কম থাকলেও পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি বেড়েছে। সুনামগঞ্জে হারভেস্টার কিনলে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন কৃষকরা। একেকটি হারভেস্টার ১০০ জন শ্রমিকের ধান কাটা মাড়াইয়ের কাজ করতে পারে। হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা মাড়াই শেষে বস্তায়ও রাখা যাচ্ছে। সুনামগঞ্জে ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৩৪৪ টি হারভেস্টার মেশিন কিনেছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। এরমধ্যে কৃষি বিভাগের হিসাব মোতাবেক ৫০ টি মেশিন অকেজো হয়ে আছে। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। অথচ এসব মেশিনে রাষ্ট্রের লাখ লাখ টাকার ভর্তুকি রয়েছে।
শাল্লার হবিবপুর ইউনিয়নের ফয়জুল্লাপুরের কৃষক লালচান মিয়া বললেন, আমার হারভেস্টার মেশিনটি দুই বছর ধরে অকেজা হয়ে পড়েছে। টাকা ফেরৎ না দিলেও মেশিনটি ফেরৎ নেবার জন্য কোম্পানীর (এসিআই কোম্পানীর) লোকজনকে অনুরোধ করেছি। তিনি জানালেন, ২০২০ সালে এই মেশিনটি চার লাখ ৭০ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। মেশিন এনে ধান কাটতেই পারেন নি তিনি।
একই উপজেলার কান্দিগাঁওয়ের কৃষক মো. ছাত্তার মিয়া বললেন, সরকারের ৭০ শতাংশ ভর্তুকি বাদে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা দিয়ে ৪ বছর আগে রিপার মেশিন কিনে বিপদে পড়েছেন তিনি। মেশিন কাজ করছে না, এখন কোম্পানীর লোকজন ইঞ্জিনিয়ারও পাঠায় না। তাদের মেশিনের বিকল হওয়া যন্ত্রপাতি অন্য কোথাও পাওয়াও যায় না। তারা যন্ত্রপাতির দামও বেশি রাখে। এই অবস্থায় সরকারের দেওয়া ভর্তুকির টাকায় কেনা এই মেশিন আমি কি করবো চিন্তা করছি।
শাল্লায় আরও কয়েকজন কৃষক আছেন যারা হারভেস্টার মেশিন নিয়ে সুবিধা করতে পারেন নি। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাহাড়ার যাত্রীপুরের হিমাদ্রী শেখর, আনন্দপুরের মনোহর রায় ও আটগাওঁয়ের মুজিবুর রহমান চৌধুরী।
শাল্লার হবিবপুর ইউনিয়নের কৃষি সুপারভাইজার জয়ন্ত কুমার দাস বললেন, হারভেস্টার মেশিনে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু কোন কৃষক যদি মেশিন নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন, তাহলে অন্যদের আগ্রহ কমে যায়।
শাল্লার উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা বিভুতোষ চৌধুরী জানালেন, শাল্লায় ১৮ টি হারভেস্টার মেশিনের মধ্যে ৪ টি কাজ করছে না।
হারভেস্টার মেশিনের বিক্রেতা অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ’এর (এসিআই)’এর সিলেটের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার অপু সাহা বললেন, শাল্লার লালচান মিয়ার মেশিন দিয়ে দুই বছর ধরে কোন কাজ করছেন না। তিনি ফোন দেবার পর টেকনেশিয়ান পাঠানো হয়েছিল, তিনি প্রয়োজনীয় যন্ত্র কিনে দেন নি। ছত্তার মিয়া কোন যোগাযোগ করেন নি। নতুন মেশিন কেনার বিষয়ে কথা বলেছেন।
এসিআইয়ের সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক ম্যানেজার সেলিম আহমেদ বললেন, লালচান মিয়া ২০১৭ সালে শাল্লা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী’র কাছ থেকে হারভেস্টার মেশিন কিনেছিলেন। এখনো এই মেশিনের কিস্তি বাবদ কোম্পানী আড়াই লাখ টাকা পায়। লালচান মিয়া টাকাও দিচ্চেন না, মেরামত করার জন্য যন্ত্রও কিনে দিচ্ছেন না। এই মেশিন যে টাকায় কিনেছেন লাল চান মিয়া, সেই পরিমাণ টাকা আয় করেছেন তিনি। তিনি যে হারভেস্টার মেশিনটি কিনেছিলেন, সেটি চায়নার তৈরি ছিল। এখন ইয়ানমারের তৈরি আরও অনেক উন্নতমানের হারভেস্টার মেশিন সরবরাহ করছি আমরা। কৃষকরা সেটি কিনে নিচ্ছেন, আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সার্ভিসও দিচ্ছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানালেন, জেলায় ৩৪৪ টি হারভেস্টারের মধ্যে ৫০ টি কাজ করছে না। যেগুলো মেরামত যোগ্য সেগুলোকে বোরো ধান কাটা মাড়াই শুরু হবার আগে মেরামত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর সঙ্গে মেশিনের মালিকরা যোগাযোগ করছেন। কৃষি বিভাগ থেকেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।