সরকার কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের নানা ধরনের প্রণোদনা বা সহায়তা জুগিয়ে আসছেন। আমাদের সংগ্রামী কৃষকরা খুব দ্রুত সনাতনী কৃষি ব্যবস্থার স্থলে এই যান্ত্রিকীকরণের আধুনিকতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। হালের লাঙল এখন ইতিহাসের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জমিতে সেচের ব্যবস্থা হয় যন্ত্র দিয়ে। ধান ভাঙানোর জন্য এখন আর বলদের প্রয়োজন হয় না। মাড়াই মেশিন সে স্থান করে নিয়েছে। আমাদের দেশীয় কৃষি প্রযুক্তিবিদরা খুব সাশ্রয়ীমূল্যে এসব কৃষি যন্ত্রপাতি বাজারে নিয়ে আসছেন। ধান কাটার জন্য যে মাড়াই মেশিন ব্যবহার করা হয়, যাকে আমরা হারভেস্টার বলি, সেগুলো বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। এসব হারভেস্টারের দামও বেশি। সাধারণ বা মধ্যম পর্যায়ের কৃষকরা এককভাবে এসব হারভেস্টার কিনতে পারেন না। একটি হারভেস্টারের ধান কাটার সক্ষমতার তুলনায় আমাদের কৃষকদের এককভাবে পর্যাপ্ত জমিও নেই। তাই সরকার হারভেস্টারের জন্য প্রায় ৭০ ভাগ ভর্তুকির ব্যবস্থা রেখেছেন। প্রতিবছরই কৃষি বিভাগের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের ভর্তৃকিমূল্যে হারভেস্টার সরবরাহ করা হয়। ধান কাটার মৌশুমে কৃষি শ্রমিকদের ব্যাপক অভাব দেখা দেয়। শ্রমিকের অপর্যাপ্ততা, অধিক মজুরি প্রভৃতি কারণে বছর বছর কৃষকরা জমির ফলন্ত ধান কাটতে সমস্যায় পড়েন। এ অবস্থায় হারভেস্টার মেশিনগুলো কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। বাজার থেকে যেসব হারভেস্টার কৃষকরা ভর্তুকিমূল্যে কিনে থাকেন সেগুলো নামী দামী বিদেশী ব্র্যান্ডের। কিন্তু নামী দামী কোম্পানিগুলো সরবরাহকৃত হারভেস্টারগুলোর মান যথাযথ পর্যায়ে সংরক্ষণ করছে না বলেই অনুমিত হয়। গত শুক্রবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সুনামগঞ্জ জেলায় ভর্তৃকিমূল্যে সরবরাহকৃত হারভেস্টারগুলোর হাল অবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। রিপোর্ট থেকে জানা যায়, জেলায় সরবরাহকৃত সাড়ে তিন শ’ হারভেস্টারের মধ্যে প্রায় ৫০টিই এখন বিকল হয়ে পড়েছে। এসব দামী মেশিন এক বা দুই বছরে বিকল হওয়ার কথা নয়। আর মেশিনগুলোর কোন সমস্যা দেখা দিলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই সার্ভিসিং করে দিতে হয়। কিন্তু কৃষকরা অভিযোগ করছেন হারভেস্টার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কোন সার্ভিস দিচ্ছে না। ফলে একদিকে মূল্যবান হারভেস্টার নষ্ট হয়ে যেমন ধান কাটার সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছে তেমনি কৃষকরা আর্থিক ক্ষতিরও সম্মুখীন হচ্ছেন। কৃষিবিভাগ ও জেলা প্রশাসনের বিষয়টির উপর দ্রুত নজর দেয়া উচিৎ।
হারভেস্টার সরবরাহকারীরা সরকারের কৃষিবান্ধব একটি কর্মসূচি থেকে নিজেদের লাভের অংক ষোল আনা তুলে নিচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিক আঁতাতের ফলে বেশি দামে নি¤œমানের পণ্য সরবরাহ করছে। এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানিগুলোর লাভ ঠিকই হচ্ছে, বরং বেশিই হচ্ছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তা আশানুরূপ ফলাফল বয়ে আনছে না। এমনও মেশিন সরবরাহ করা হয় যেসব মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশ স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য থাকে না। শাল্লার একজন হারভেস্টার গ্রহণকারী কৃষক এরকম অভিযোগ করেছেন। ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি হারভেস্টার, যেখানে ৭০ ভাগ সরকার ভর্তুকি হিসাবে কোম্পানিকে পরিশোধ করেন, তা নিয়ে এরকম অভিযোগ অনাকাক্সিক্ষত। বিকল হারভেস্টারগুলো যাতে সরবরাহকারী কর্তৃক দ্রুত চালু করে দেয়া হয় তা নিশ্চিত করতে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানাই।
স্থানীয়ভাবে আমাদের কৃষি প্রযুক্তিবিদদের দেশের আবহ্ওায়া ও মাটির উপযোগী হারভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্র তৈরির দিকে বিশেষ উৎসাহ দিতে হবে। এগুলোর উপযোগিতাও হবে বেশি।এরকম মেশিন দেশে উৎপাদন করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দাম কমে আসবে। আমাদের বিশ্বাস তা কৃষকদের ক্রয়সীমার মধ্যেই থাকবে। তখন সরকারের ভর্তুকি বাবদ খরচের পরিমাণও কমে আসবে। এজন্য বিদেশি উৎপাদনকারী কোম্পানির সাথে সব ধরনের আঁতাত করার পথ বন্ধ করে দিতে হবে। কোম্পানিগুলো কায়দাবাজী করে নিজেদের ব্র্যান্ডকে তালিকাভুক্ত করিয়ে নেয় এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এই দুরভিসন্ধি সম্পর্কেও সজাগ থাকতে হবে।

