বিক্রয় কেন্দ্র থেকে খালি হাতে ফিরছে মানুষ

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে ওএমএস’র লাইনে দাঁড়ানোদের অর্ধেক মানুষও চাল নিয়ে ফিরতে পারছেন না। কোথাও কোথাও শূন্য হাতে ফেরার সংখ্যা আরো অনেক বেশি। জেলায় এই পর্যন্ত সরকারীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও জেলে পরিবারের যে তালিকা হয়েছে এবং সাহায্য দেবার যে তালিকা হয়েছে তাতে ৭০ হাজারেরও বেশি পরিবার এখনো সাহায্যের তালিকায়-ই আসেনি। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
বুধবার সকালে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রানালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা বিশেষ করে ১৫ টাকা কেজি মূল্যের ওএমএস’র চাল বিক্রয় কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে। সরকারি কর্মকর্তা পরিচয় জানতেই কয়েকজন এগিয়ে বললেন,‘৪ দিন ধইরা (ধরে) আয়রাম, পর্তিদিন (প্রতিদিন) খালি হাতে ফির্ইরা (ফিরে) যাই স্যার।
বীরগাঁও’র রাবেয়া বেগম নামের এক দরিদ্র কৃষাণী এগিয়ে এসে বললেন,‘৩ টার সময় আইয়া (এসে) উবাইছি (দাঁড়িয়েছি), আমার হমকে (সামনে) যতজন আছে, হেরা (তারা) নেওয়ার পরে, আমি আর পাইমুনি স্যার ?
অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান এ সময় বললেন,‘আমরা সমস্যা বুঝতে পারছি, এজন্যই ওএমএস কেন্দ্র দ্বিগুন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দ্বিগুন কেন্দ্র হলে এখন আপনারা যেখানে ২০০ জন পাচ্ছেন, সেখানে ৪০০ জন চাল পাবেন। তাহলেই সমস্যা মিটে যাবে।’
কেবল দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে এই অবস্থা নয় পুরো জেলায় একই চিত্র। এক-একটি ওএমএস কেন্দ্রের ডিলারের ৫ কেজি করে ২০০ জনকে চাল দেবার ক্ষমতা থাকলেও লাইনে দাঁড়াচ্ছে ৪০০ থেকে ১০০০ মানুষ। অনেকে বুঝতে পারছে চাল পাবে না। তবুও চাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে পাবার ভরসা নিয়ে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের চালের ডিলার মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বুধবার আমার কেন্দ্রে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ       
দাঁড়িয়েছিলেন। ভোর ৩ টা থেকে এসে মানুষ লাইনে দাঁড়াচ্ছে। কেউ কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে তার স্থানে ইট রেখে পেছনের লোককে বলে যাচ্ছে, এটি থাকলো, সিরিয়েল আসলে এসে চাল নিয়ে যাব। পাকা সড়কে লাইন গেলে ইটের টুকরা দিয়ে নিজের স্থানের দখল রাখার জন্য নাম লিখে অন্য কাজ সেরে আসছে।’ তিনি জানান, বুধবার তাঁর ১ টন চাল বিক্রি শেষ হবার পর জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমার সখিনা বানু, জয়কলসের অঞ্জলি দাস, সরি দাস, ডুংরিয়ার আব্দুছ ছোবহান ও আব্দুল ওদুদ এসে অনুনয়-বিনয় করে গেছেন। বলে গেছেন কালও তারা আসবেন। দয়া করে কাল যেন তাদেরকে চাল দেওয়া হয়।
সুনামগঞ্জ শহরের ওএমএস কেন্দ্রগুলোতে কোথাও কোথাও সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়ানোর স্থান না থাকায় বৃত্তাকারে একাধিক লাইনে দাঁড়াচ্ছেন ওএমএস ক্রেতারা।
জেলার অনেক স্থানেই লজ্জা ছেড়ে যারা কোনদিন এধরনের লাইনে দাঁড়াননি তারাও ওএমএস’র লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
শাল্লা উপজেলার আটগাঁওয়ের কালা মিয়া ৩ হাল জমি চাষ করেছিলেন। নিজের সারা বছরের খাবার ধান রেখেও অন্যান্য খরচের টাকার জন্য ধান বিক্রি করতেন।
কালা মিয়া বললেন,‘লজ্জা ছেড়ে লাইনে দাঁড়িয়েছি, অনেকে আমার দিকে চেয়ে থেকেছে, নিজের কষ্ট হয়েছে, কিন্তু করার কিছু নেই, চাল নিলেই খাওয়া, না হয় না খেয়ে থাকতে হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক জাহেদুল হক বলেন,‘সুনামগঞ্জে কৃষক পরিবার রয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩১৬ টি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৮ পরিবার।  জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শংকর রঞ্জন দাস বলেন,‘কার্ডধারী জেলে পরিবার রয়েছে ৮৪ হাজার ২৪৮ টি। জলাশয়ে নদীতে মাছ মরে কমে যাওয়ায় বিপদে পড়েছে ৪৪ হাজার ৪৪৫ পরিবার।’
এই দুই কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মোতাবেক জেলে ও কৃষক মিলিয়ে ৩ লাখ ২১ হাজার ৬৩৩ পরিবার এবার খাবার সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত সরকারি সাহায্য বলতে ১০ টাকা কেজি’র চাল দিনে এক কেজি অর্থাৎ মাসে ৩০ কেজি করে পাচ্ছে ৯১ হাজার ৫৯০ পরিবার। ১৫ টাকা কেজিতে ৪৫ টি কেন্দ্র থেকে ৯০০০ পরিবার নিচ্ছে ৫ কেজি করে ওএমএস’র চাল। এছাড়া সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে দেড় লাখ পরিবার মাসে ৩০ কেজি করে চাল এবং ৫০০ টাকা পাবে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক  মো. কামরুজ্জামান।
এই পর্যন্ত উদ্যোগ নেওয়া অপ্রতুল সহায়তা কর্মসূচি প্রতিদিন চালু থাকলেও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং মৎস্য বিভাগের তালিকা অনুযায়ী-ই আরো প্রায় ৭১ হাজার পরিবার সাহায্য বঞ্চিত হচ্ছেন। বেসরকরি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. জহেদুল হক বলেন,‘সকল কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি হিসাবে করলে ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা হবে। এর মধ্যে কেউ আংশিক, কারও কারও সব ফসলই ডুবেছে।’
কৃষকদের পক্ষে আন্দোলনরত হাওর বাঁচাও-সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা-আইনজীবী বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে। ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।’
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান বলেছেন,‘জেলায় ১৫ টাকা কেজির ৪৫ টি ওএমএস কেন্দ্র চালু রয়েছে। প্রতিদিন এসব কেন্দ্রে ১ টন চাল ও ১ টন আটা বিক্রি হয়। আমরা বুঝতে পারছি এটি যথেষ্ট নয়। কেন্দ্র বাড়ালে চাপ কমবে। এজন্য আমরা কেন্দ্র দ্বিগুন করার প্রস্তাব দিয়েছি। আটা এখানে কম চলে, এজন্য আটার বদলে চাল দেবার জন্যও সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতনদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।’