বাংলা লোকজ ধারার সংগীতের একজন বড় প-িত ব্যক্তি ছিলেন কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। এই অসামান্য মেধাবী শিল্পী ও সংগীত বিশেষজ্ঞ মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর সফরসঙ্গীরা গুরুতর আহত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই মর্মান্তিক দুঃসংবাদ প্রচার হওয়া মাত্র সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। শোকের এই ঢেউ আমাদের দেশকেও ভাসিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গুণী শিল্পীর অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে পোস্ট দিচ্ছেন বহু মানুষ। এইসব মন্তব্য থেকে বুঝা যায় কালিকার অবস্থান এই বাংলার মানুষের মনে কতোটা জায়গা করে ছিল। আমরা যারা সিলেট অঞ্চলের মানুষ তাদের কাছে এই মৃত্যু আরও ভারী। কারণ পৈত্রিক সূত্রে সিলেটের সাথে ছিলো তার নাড়ির সম্পর্ক। সিলেটের ঢাকা দক্ষিণে ছিলো তাঁর পৈত্রিক নিবাস। সংগত কারণেই সিলেট অঞ্চলের লোকজ ধারার গানকে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহের বিষয়ে পরিণত করেছিলেন। এই অঞ্চলের বহু গান তিনি ভারতে জনপ্রিয় করেছেন। বিখ্যাত বাংলা টিভি চ্যানেল তারা মিউজিক ও জি বাংলায় এখন সিলেট অঞ্চলের বিশেষ করে রাধারমণ-হাছনরাজা-আব্দুল করিমের যেসব গান গীত হয়ে তার পিছনে অবদান কালিকা প্রসাদের। গতবছর শাহ আব্দুল করিমের জন্ম শতবার্ষিকীতে কলকাতায় যে করিম উৎসব হয়েছে তার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। সিলেটের সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত এই শিল্পীর আকষ্মিক প্রয়াণে আমরা মর্মাহত, শোকগ্রস্ত এবং বেদনাহত। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
এই সময়ে এসে বাংলা লোক সংগীতের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব যেন আপনা আপনি তাঁর বিশাল স্কন্ধে আরোপিত হয়ে গিয়েছিল। তিনিও আনন্দচিত্তে সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। লোক সংগীতকে শহরের নাগরিক মঞ্চে কীভাবে জনপ্রিয় করতে হয় সেই মুন্সিয়ানা ছিলো তাঁর আয়ত্ত্বে। তিনি রীতিমত প্রতিটি গানের প্রতিটি লাইন ও শব্দ নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণা করেছেন বাণী¯্রষ্টার ব্যক্তি ও সামাজিক জীবন এবং এর সাথে ঐতিহাসিক যে পরম্পরা রয়েছে তা নিয়ে। তিনি গানের বিকৃতি রোধে ছিলেন সোচ্চার। লোক সংগীতে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়েও তিনি ছিলেন স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। সম্পূর্ণ দেশিয় যন্ত্র দিয়েই অপূর্ব সুরমুর্ছনা তৈরিতে পারঙ্গম ছিলেন তিনি ও তাঁর দল দোহার। তাঁর এই অকাল প্রয়াণ লোকজ সংগীতের এই একাডেমিক চর্চার জায়গাটিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে নিঃসন্দেহে। একজন কালিকাপ্রসাদ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। তাই বিকল্প কালিকা প্রসাদ আমরা পাব না। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করে আরও অনেকে এই ধারায় অগ্রসর হবেন, একথা সত্য।
কালিকাপ্রসাদ সুনামগঞ্জেও এসেছিলেন। ২০১৫ সনের নভেম্বর মাসে রাধারমণ উৎসবে। তিনি ও তাঁর দল দোহার সেদিন গানের জাদুতে কথার জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছিলো। তিনি সেদিনও কলকাতায় লোকগানের বিকৃতি বিষয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সেইসময় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের পক্ষ থেকে তাঁর একটি ছোট্ট সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিলো যা ১১ নভেম্বর’২০১৫ তারিখে প্রকাশিত হয়। ওই নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে আমরা তাঁর অগাধ পা-িত্য ও সরলতার পরিচয় পেয়েছিলাম। আজ যখন তিনি নেই তখন আমরা স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করছি। আজ সংস্কৃতি অঙ্গনে শোকের যে হাহাকার তৈরি হয়েছে তাতে আমরাও শামিল। বিদায় কালিকাপ্রসাদ, বিদায় সংগীতের হৃদ্ধ পুরুষ। তুমি থাকবে আমাদের হৃদয়ে হৃদয়ে।

