বিদায় ২০১৯, মঙ্গল হোক বাংলাদেশ

পৌষের বিষন্ন শীতের সাথে আজ বিদায় নিতে চলেছে খ্রিস্টিয় ২০১৯ সন। আমাদের যাপিত জীবনে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ওতপ্রোত সম্পর্কের কারণে ইংরেজি বছর শেষ হওয়ার বিষয়টি আমরা নানাভাবে টের পাই। বছর শেষ হওয়ার সাথে অনেক হিসাব-নিকাশ জড়িত থাকে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন শেষ হয় ইংরেজি বছর ধরে। আগামীকাল নতুন বই হাতে উচ্ছ্বসিত হবে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা। সরকারের বহু কৃতিত্বের মাঝে এটিও একটি যে, বছরের পয়লা দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তোলে দিতে পারছে ধারাবাহিকভাবে। ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের হিসাবের সমাপনী জের টানবে আজকের দিনে। নতুন বছরে নতুন করে হিসাব শুরু করবে তারা। প্রাত্যহিক জীবনে অপরিহার্য যে বছর সেটি নিয়ে সাধারণ্যে একটি বেশি আলাপ আলোচনা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। আজকের রাতটি কিছু বিত্তবান শ্রেণি উচ্ছল ও উশৃঙ্খলভাবে উদযাপন করবে থার্টিফার্স্ট নাইট নাম দিয়ে। এই ধরনের উদযাপনের সাথে বাঙালি সংস্কৃতির দূরতম সম্পর্ক না থাকলেও আরও অনেক কিছুর মত এই বদঅভ্যাসটিও আমাদের সংখ্যাল্প একটি গোষ্ঠী বনেদিপনা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। মূলত দীর্ঘদিন ইংরেজ শাসনের অধীনে থাকার কারণে ইংরেজ ও ইংরেজি নিয়ে আমাদের ভিতর যে আতিশয্য তৈরি হয়েছে, ভাষা আন্দোলনের মত প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিজয়ী জাতি হয়েও আমরা সেই আতিশয্য ভুলতে পারিনি। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই রয়েছে এই সাংস্কৃতিক পরাশ্রিততা। গ্রামের মানুষের এসবের বালাই নেই। কবে কোন ইংরেজি বছর শেষ কিংবা শুরু হল সে নিয়ে তাদের নেই বিন্দুমাত্র আগ্রহ। তারা আটপৌরে বাংলা সনের হিসাব নিয়েই সন্তুষ্ট। বাংলা সনকে বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজের মনে করে তাদের উৎপাদন ও উৎসব, জীবনযাপন ও সম্পর্ক, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য; সবকিছুতেই মিশিয়ে রেখেছেন। এত টানাপোড়েনের ইংরেজি বছরটি শেষ হতে চলেছে আজ। কালকের সূর্যোদয় মানেই নতুন আরেকটি বছর। ২০২০ খ্রিস্টিয় সন। পুৃরাতনের বিদায় আর নতুনের উদ্বোধনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু বলতে চাই, মঙ্গল হোক বাংলাদেশ।
সালতামামির খতিয়ানে পুরোনো বছর জাতীয় জীবনে অনেক কিছু যেমন উপহার দিয়েছে তেমনি এমন কিছু ঘটনাও রয়েছে যা আমাদের দুঃখের কারণ হয়েছে। বছরের শুরুতেই তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগের সরকার গঠন ছিল বছরের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনা। এই নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দল বিএনপি ভোট কারচুপির যে অভিযোগ এনেছিল সেটি শেষ পর্যন্ত তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দুর্নীতি ও মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে জোরেশোরে। নিজেদের দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখেছি আমরা। একটি রাজনৈতিক সরকারের জন্য এ ধরনের কর্মকা- নিঃসন্দেহে কঠিন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখানে সফলতা দেখিয়ে চলেছে। বেশ কয়েকটি অগ্নিকা-ের ঘটনায় বহু মানুষের মৃত্যু ছিল বছরের বেদনাদায়ক অধ্যায়। এক চকবাজারেই ২০ ফেব্রুয়ারি ৭৮ ব্যক্তি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। দেশব্যাপী উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে নতুন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে আসেন এ বছরে। বহু বছর পর ডাকসু নির্বাচনও হয় ২০১৯ সনে। আ,লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, জাপা প্রেসিডেন্ট সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ মুত্যুবরণ করেন এ বছর। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ও ধানের ব্যাপক দরপতন ছিল বছরের আলোচিত অর্থনৈতিক খবর।
সময়ের অতিক্রমণ মানেই রাশি রাশি ঘটনা তৈরি হওয়া। ঘটনার কারণেই সময় গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনা ঘটে বলেই সময়ের হিসাবকে আলোচনায় আনি। ২০১৯ সনও এ কারণেই আলোচনার বিষয়বস্তু। সময় যেমন থামে না তেমনি ঘটনাও থেমে যাবে না। নুতন বছরের প্রথম মুহূর্ত থেকেই ঘটতে শুরু করবে এমন অম্লমধুর নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা। আমরা আশাবাদী মানুষ। তাই চাই সময় ভাল সবকিছুর প্রসূতি হোক। এই প্রত্যাশায় আমরা নতুন বছরে আলোকিত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ দেখার বাসনা পোষণ করি।