অবৈধ পথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেতে বহু তরুণ যুবক পথে মারা পড়ে। এরা গভীর সাগরে পানিতে পড়ে মরে। কেউ গভীর জঙ্গল পারি দিতে গিয়ে মরে। এরা যেতে চায় স^প্নের ঠিকানায়। কিন্তু স্বপ্নের ঠিকানা তাদের অজানা। এরা দালাল ধরে দেশে। সহায়-সম্পদ বিক্রি করে অভিভাবকরা টাকা-পয়সার জোগান দেন। দালালরা একটি পাসপোর্ট করিয়ে যেকোন দেশের একটি ভিসা ধরিয়ে এদের বিমানে তোলে দেয়। এরা প্রথম গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছার পর এক অনিশ্চিত জীবনের খোঁজ পায়। তাদের লক্ষ যাবতীয় সুখের সম্ভার নিয়ে অপেক্ষমাণ ইউরোপের কোন দেশ। প্রথম গন্তব্য থেকেই এদের যাত্রা শুরু পলায়নপর এগিয়ে চলার। দ্বিতীয় গন্তব্য, তৃতীয় গন্তব্য হয়ে এরা সেখানে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু স্বপ্নের ঠিকানায় পোঁছানো হয় না এদের। পথেই মরে পড়ে থাকে। এদের লাশও দেশে আসে না। বেওয়ারিস হয়ে অজানা বিদেশেই এদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। দেশে ওরা টগবগে তরুণ ছিল। এরা কারও সন্তান, কারও ভাই, কারও স্বামী। ওরা দেশে পরিবার পরিজনের আদর-ভালবাসায় বড় হয়েছে। পরিবারের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ তৈরি হওয়ার পর এরা দেশে নিজেদের কোন ভবিষ্যৎ দেখে না। দেশে কাজ নেই। জীবিকা নেই। নেই নিশ্চিত উপার্জনের পথ। তাই এরা বেপরোয়া হয়। এদের এই অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় দেশের ভিতর নানা স্থানে বসে থাকা দালালচক্র। দালালরা স্বপ্ন দেখায়। বিমানে চড়তে পারলেই নিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা দেয়। তাই পাগলের মত, পতঙ্গের মত এরা সেই প্রলোভনের ফাঁদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই ফাঁদ থেকে আর বেরোতে পারে না কেউ। এই অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের শতকরা পচানব্বই জনের ভাগ্যেই নাকি লেখা থাকে বিড়ম্বনা। হয় বিদেশে মরে গিয়ে বেঁচে যায় নয় দেশে ফিরে আসে সর্বশান্ত হয়ে। এদের যারা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সেই আদম ব্যবসায়ীদের কিছুই হয় না। আদম ব্যবসায়ীরা একের পর এক শিকার ধরে আর পকেট ভরে। মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে এমন সর্বনাশা জুয়া খেলা বুঝি কেবল আমাদের মত দারিদ্রপীড়িত দেশগুলোতেই সম্ভব।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ অনুসারে সুনামগঞ্জের তিন তরুণ গ্রিস যাওয়ার পথে মারা গেছে। ওমান ইরান তুরস্ক হয়ে সর্বশেষ গ্রিস পাড়ি দেবার পথে গভীর সাগরে সলিল সমাধি ঘটে এই দিন তরুণের। এদের দেশীয় স্বজনরা এখন শোকে পাগলপারা। হতভাগ্য তরুণদের লাশ দেশে আসবে কি-না তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। হতভাগ্য পিতা-মাতা সন্তানের চেহারা শেষবারের মত দেখা থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। এদের গল্পও একইরকম। দালাল-ফাঁদে আটকে পড়ার। সংবাদে দালালদের নাম ধাম সবই আছে। কিন্তু কী হবে?
বিদেশে কর্মজীবিদের মাধ্যমে উপার্জন হওয়া বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির সবচাইতে বড় জায়গা। এই কর্মজীবীরা মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও খরচেই বিদেশ গমন করেন। বিদেশের শ্রমবাজারে প্রচুর চাহিদা আছে। সাম্প্রতিক কোভিড পরিস্থিতি উন্নত দেশের শ্রম চাহিদা বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই বিদেশ যাওয়ার বৈধ পন্থাই রয়েছে অনেক। তার পরেও অবৈধ অভিবাসন থেমে নেই। এর প্রধান কারণÑ দালাল চক্রের অব্যাহত প্রচারণা, তরুণ ও যুব সমাজের তথ্য-অজ্ঞতা ও সরকারি তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা। সরকারের কঠোর তদারকী জারি থাকলে দালালরা এইভাবে হাজার হাজার তরুণ যুবকদের এই ফাঁদে ফেলতে প্রাত না। বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির জায়গাটি যদি সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারত তাহলে এইসব তথাকথিত দালালদের উৎপাতের হাত থেকে বাঁচা যেত। সে হওয়ার কই? সবকিছুকে মুক্ত করতে গিয়ে আমাদের অর্থনীতির এমন এক মজবুদ জায়গাকে আমরা জুয়া খেলার দানে পরিণত করে ফেললাম, আফসোস।
সলিল সমাধি প্রাপ্ত সুনামগঞ্জের তিন তরুণকে যারা অবৈধভাবে বিদেশ যেতে প্রলুব্ধ করেছিল তাদের আদৌ কোন বিচার হবে কি?

