বিশেষ প্রতিনিধি
জাতীয় গ্রীড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ হলেও সুনামগঞ্জের প্রায় ২৫ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহকের ভোগান্তি লেগেই আছে। লোকবল সংকট, যারা আছে এদেরও দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং পুরাতন জীর্ণ-শীর্ণ লাইনের কারণে এমনটা হচ্ছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীলরাই স্বীকার করেছেন। এই অবস্থা সুনামগঞ্জে চলছে বছরের পর বছর ধরে। চলতি রমজান মাসে জেলার চাহিদামত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীড থেকে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু গত ৩ দিনের ৭২ ঘণ্টায় কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টাই সুনামগঞ্জের প্রতিটি ফিডারের গ্রাহকরা বিদ্যুৎ পাননি।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মচারী জানান, এখানকার প্রধান সমস্যা অফিসে দায়িত্বরত স্থানীয় কর্মচারীরা। এরা দীর্ঘদিন ধরে এই অফিসে কাজ করছেন। এদের কেউ কেউ কাজের চেয়ে, অফিসে গ্রুপিং ও শ্রমিক রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়, কেউ কেউ লাইনে ত্রুটি সারানোর কাজে গুরত্ব না দিয়ে, নতুন লাইন সংযোগসহ নানা রোজগারের ধান্দায় ব্যস্ত থাকে। এছাড়া কর্মচারী সংকটও লেগেই আছে অফিসে। শহরের অভ্যন্তরীণ ৫ টি ফিডারের সব কয়টি লাইন-ই জরাজীর্ণ হয়ে আছে। বৃষ্টি হলেই লাইনে বা ট্রান্সফরমারে ত্রুটি দেখা দেয়। কিন্তু ত্রুটি সারানোর লোকজন দ্রুত কাজ না করায় ভোগান্তি পোহাতে হয় গ্রাহকদের। গত দুই দিন দিরাই-শাল্লা ফিডারে বিদ্যুৎ-ই ছিল না। অথচ. সুনামগঞ্জে জাতীয় গ্রীড থেকে যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। সব কয়টি ফিডার চালু থাকলেও বিদ্যুতের ঘাটতি হতো না।
গত তিন দিনের মধ্যে বুধবার জাতীয় গ্রীড থেকে ৯ মেগাওয়াট, বৃহস্পতিবার ৮ মেগাওয়াট এবং শুক্রবার ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। সুনামগঞ্জের ২৫ হাজার গ্রাহককে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও ১০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ লাগে না। অথচ. বুধবার ২৪ ঘণ্টায় গড়ে প্রত্যেক ফিডারে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবারও ছিল একই অবস্থা।
অর্থাৎ ৩ দিনের ৭২ ঘণ্টায় কমপক্ষে ১৮ ঘণ্টা প্রত্যেক ফিডারের গ্রাহকরা বিদ্যুৎ পাননি।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মচারী নাম না ছাপার শর্ত দিয়ে বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী বা অন্য কর্মকর্তারা লাইনম্যানসহ যারা লাইনে কাজ করে তাদের দিয়ে কাজ আদায় করতে পারেন না, তাদের নিজেদেরও নানা দুর্বলতা রয়েছে, এজন্য কঠোরও হতে পারেন না, এজন্য এই অফিসের চেইন অব কমা-ও নেই বললেই চলে’।
সুনামগঞ্জ বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামানও এসব অভিযোগ ও কর্তব্য পালনে অবহেলার অনেক কিছুই স্বীকার করে বলেন, ‘জাতীয় গ্রীড থেকে আমরা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছি না সেটা বলা যাবে না, মূলত. বিদ্যুৎ পেয়েও গ্রাহকদের সরবরাহ করা যাচ্ছে না’। কারণ হিসাবে তিনি বললেন, ‘শহরের এবং শহরতলির ৯০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন-ই জীর্ণ-শীর্ণ। অনেক ট্রান্সফরমারের অবস্থাও খারাপ। গরম ট্রান্সফরমারে পানি পড়লেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ টি ট্রান্সফরমার এমন হয়, এগুলো মেরামত ও লাইনে ত্রুটি সারানোর জন্য লোকবলের সংকট রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ এখানে ৮৩ টি, আছেন ৪০ জন। এরপর আবার দীর্ঘদিন ধরে এখানে স্থানীয় যারা কাজ করছে, তারা ফাঁকিবাজি করে, আবার শ্রমিক রাজনীতিও করে, কিছু বললেও সমস্যা। বাইরের কর্মচারীরা কাজ ঠিকই করে। আমরা কাজ আদায় করার চেষ্টা করছি না, এমন অভিযোগ ঠিক নয়’। নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের জরাজীর্ণ লাইন মেরামত করতে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা মে মাসে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু এই প্রকল্পের লোকবল নিয়োগ বা অন্য প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এই প্রকল্পের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাইনে কাজ হলে সমস্যা কিছুটা কমবে।


